উত্তম কুমারকে পাইনি বলে বিয়ে করিনি, তা নয়: সাবিত্রী

বিনোদন ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম
বিয়ে করা আর হয়ে ওঠেনি অভিনেত্রী ভারতীয় বাংলা সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের। ১৯৫১ সালে উত্তম কুমার অভিনীত ‘সহযাত্রী’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। তবে এক সময় উত্তম কুমারের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের খবর চাউর হয়ে গিয়েছিলো, এমনকি দুইজনে একসঙ্গে থাকছেন বলে জোর প্রচার হয়েছিলো। তবে সেসব যে মিথ্যে ছিলো সেকথা জানিয়েছেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় নিজেই। বাংলাদেশের কুমিল্লার মেয়ে সাবিত্রী ১০ বোনের সবচেয়ে ছোট। দেশ ভাগের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে পাঠিয়ে দেযা হয়েছিলো কলকাতায়। সেখান থেকেই তার জীবন সংগ্রামের শুরু।

১৯৫২ সালে ‘পাশের বাড়ি’ সিনেমায় কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। মুক্তির পর সিনেমাটি ব্যবসায়ীকভাবে সফল হয়। ১৯৫৪ সালে আশাপূর্ণা দেবীর গল্প অবলম্বনে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমায় জুটি বাঁধেন উত্তম-সুচিত্রা। পর্দায় এ জুটির রোমান্স দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। সিনেমাটি দারুণভাবে ব্যবসাসফল হওয়ায় ইন্ডাস্ট্রিতে নায়ক উত্তম কুমারের আসন স্থায়ী হয়ে যায়। সুচিত্রা সেন ছাড়াও সাবিত্রী চ্যাটার্জি, সুপ্রিয়া চৌধুরী, শর্মিলা ঠাকুর, মাধবী মুখোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় নায়িকার বিপরীতে অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন উত্তম কুমার। এর মধ্যে উত্তম-সাবিত্রী জুটি অন্যতম।

১৯৫১ সালে সাবিত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে উত্তম কুমারের। বড় পর্দার রোমান্সের বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমের সম্পর্ক ছিলেন তারা। এ নিয়ে তখন অনেক জলঘোলা হয়েছে। উত্তম ব্যক্তিগত জীবনে সংসারী হলেও ৮১ বছর বয়সি সাবিত্রী এখনো একা। উত্তম-সুচিত্রার প্রেম, উত্তম-সাবিত্রীর প্রেম নিয়ে ভারতীয় একটি টেলিভিশনে কথা বলেছেন বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী।

উত্তম-সুচিত্রার মধ্যে কী প্রেমের সম্পর্ক ছিলো? এমন প্রশ্নের জবাবে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমি তো তা জানি না, আমার মনে হয় না। কারণ আমি তো ওদের কাছ থেকেই দেখেছি। এরপরই প্রশ্ন করা হয় উত্তম-সাবিত্রীর মধ্যে কী প্রেমের সম্পর্ক ছিলো? উত্তরে সাবিত্রী বলেন, তা ছিলো খানিকটা। তবে রটনাটা বেশি, আসলটা কম ছিলো। তখন শোনা গিয়েছিলো যে, আমায় বিয়ে করে বালিগঞ্জে বাড়ি ভাড়া করে আছে উত্তম-যা নিয়ে ঝড় বয়ে গেলো, সেসব কিন্তু কিচ্ছু না। তারপর আমার জীবনে আরো ট্র্যাজেডি নেমে আসে।

সাবিত্রী আরো বলেন, দেখুন আমি কখনো চাইনি সে তার সংসার ছেড়ে চলে আসুক। আমার কপালে যদি এখন বিবাহিত পুরুষই জোটে, তাহলে আমি কী করবো? ভালোবাসবো না? কিন্তু আমি কারো ঘর ভাঙবো না। যার জন্য আমার নিজের ঘর হয়নি। তবে উত্তম কুমারকে পাইনি বলে বিয়ে করিনি, তা নয়। আমার অনেক বন্ধু ছিলো যাদের সবাই বিবাহিত, আর আমি কারো ঘর ভাঙতে চাইনি। আমার কতো ভালো সম্বন্ধ এসেছে, উত্তম কুমার গিয়ে ভেঙে দিয়েছে। উত্তম আমার প্রতি পজেসিভ ছিলো। তবে অনেকে বলেন আমি মিথ্যা বলছি, তাই এটা নিয়ে আমি কোনো দিন কিছু বলিনি।

সাবিত্রী বলেন, সংসার করিনি তার জন্য কোনো আফসোস নেই। কারণ আমার দিদির ছেলে-পুলেদের মানুষ করেছি। এখনো হয়তো তাদের ডাকলেই তারা আসবে, তবে সবারই তো সংসার আছে। এতো বড় বাড়িতে তো কথা বলারও সঙ্গী চাই। তাই একা লাগে।

প্রথম দিনের শুটিংয়ের স্মৃতি নিয়ে তিনি বললেন, শুটিংয়ের প্রথম দিন বাসে করে গিয়েছিলাম স্টুডিওপাড়ায়। পাশের বাড়ি থেকে একটি শাড়ি নিয়েছিলাম। প্রথম অভিনয়ের পর সবাই হাততালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলো। তখন মাসে আমাকে ২০০ টাকা করে দিত। তাও তখন তিন মাসের টাকা পাইনি।

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লার কমলাপুর গ্রামে ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তাঁর বাবা তখন ভারতে রেলওয়েতে চাকরি করতেন। ১০ বোনের মধ্যে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সবার ছোট। দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ছিলেন টালিগঞ্জে এক বোনের বাড়িতে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অভিনয়জীবন। প্রখ্যাত অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মঞ্চে নিয়ে আসেন। তারপর সুযোগ পেয়ে যান চলচ্চিত্রে। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘পাশের বাড়ি’, ‘রাতভোর’, ‘উপহার’, ‘অভয়ের বিয়ে’, ‘নূপুর’, ‘গলি থেকে রাজপথ’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘কুহক’, ‘বধূ’, ‘ভ্রান্তি বিলাস’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘জয়া’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘মাল্যদান’। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি এখন তিনি টিভি সিরিয়ালেও অভিনয় করছেন।

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় পেয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মশ্রী’, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’সহ নানা পদক ও সম্মাননা।