স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি জলঢাকার পরিবেশ

নীলফামারী সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ইটভাটায় শ্রমিকদের থাকার ঘরে কয়লার ট্রাক উল্টে প্রাণ হারানো ১৩ শ্রমিকের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায়। নিহত শ্রমিকদের বাড়িতে বাড়িতে এখন চলছে কান্না আর আহাজারি। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা এখন দিশেহারা। আজ শুক্রবার (২৫ জানুয়ারি) ভোরে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ঘোলপাশা ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের একটি ইটভাটায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জলঢাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রাণ হারানো শ্রমিকদের বাড়িতে বাড়িতে ছুটে আসেন প্রতিবেশী ও স্বজনরা।

নিহতরা হলেন- জলঢাকা উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের সুরেশচন্দ্র রায়ের ছেলে রঞ্জিত চন্দ্র রায় (৩০), মানিক চন্দ্র রায়ের ছেলে তরুণ চন্দ্র রায় (২৫), কিশর চন্দ্র রায়ের ছেলে সংকর চন্দ্র রায় (২২), অমল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপু চন্দ্র রায় (১৯) ও কামাক্ষা রায়ের ছেলে অমিত চন্দ্র রায় (২০), পাঠানপাড়া গ্রামের নূর আলমের ছেলে মো. মোরসালিন (১৮), ফজলুল করিমের ছেলে মো. মাসুম (১৮), জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে মো. সেলিম (২৮) ও রামপ্রসাদের ছেলে বিল্লব (১৯), শিমুলবাড়ি গ্রামের মনোরঞ্জন রায় (১৯) ও দিনেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে মিনাল চন্দ্র রায় (২১) এবং রাজবাড়ি গ্রামের খোকা চন্দ্র রায়ের ছেলে বিকাশ চন্দ্র রায় (২৮) ও ধলু রায়ের ছেলে কনক চন্দ্র রায় (৩৪)।

এই দুর্ঘটনার পর সকালে ওই নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় কান্না-আর্তনাদ। নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। একসঙ্গে এতোজনকে হারিয়ে এলাকাজুড়েই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মীরগঞ্জ ইউনিয়নের নিজপাড়া কুড়ারপার গ্রামের নিহত শংকরের মা জনতা বালা ও নিহত প্রশান্ত রায় দিপুর মা গীতা রানী সন্তান হারিয়ে কাঁদছেন আর বিলাপ করে বলছেন, বুকের মানিকেরা কবে বাড়ি আসবে। ওরা যে যাবার সময় বলেছিলো টাকা রোজগার করে সংসারের অভাব দূর করবে।

সেখানেই কথা হয় কুমিল্লা থেকে আসা নিহতদের সহকর্মী অনুকুল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। গত পরশু আমি বাড়িতে আসি। আসার সময় তারা বলেছিলো, ‘আমরাও কয়েকদিন পর বাড়ি যাবো।’ কিন্তু তাদের আর বাড়িতে আসা হলো না।

একই গ্রামের নিহত অমিত চন্দ্র রায়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অমিতের মা সাবিত্রী সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ। বাবা কামিক্ষ্যা চন্দ্র বুকের ধনকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

ভাই নারায়ণ চন্দ্র বলেন, দুই মাস আগে সহপাঠিদের সঙ্গে রোজগারের আশায় বাড়ি ছেড়েছিলো অমিত। কিন্তু আজ এটা কি হলো।

একই গ্রামের নিহত রঞ্জিতের বাড়ির চিত্রও একই। রঞ্জিতের স্ত্রী সচি রানী তার একমাত্র ১০ বছরের প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তান সাথী রানীকে নিয়ে বিলাপ করে কাঁদছেন আর বলছেন, এখন আমার সন্তানের কি হবে?

মীরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির খান হুকুম আলী বলেন, ঘটনাটি জেনে সঙ্গে সঙ্গেই সমবেদনা জানাতে নিহতের বাড়িতে যাই। আমি প্রতিটি পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ দাবি করছি।

জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুজাউদৌলা বলেন, এরই মধ্যে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও চৌদ্দগ্রাম ইউএনওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ জলঢাকা আসলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।

নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি শোকপ্রকাশ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য আমার ও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিণ শ্রমিকদের পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বলেন, মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আমরা প্রত্যেকে মর্মাহত। নিহত শ্রমিকদের প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হবে। এরই মধ্যে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে নিহত শ্রমিকদের বাড়িতে পাঠানো হয়ছে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোলপাশা ইউনিয়নের নারায়ণপুর এলাকায় কাজী অ্যান্ড কোং নামক ইটভাটায় একটি ট্রাক থেকে কয়লা আনলোড করার সময় হঠাৎ তা উল্টে গিয়ে ভাটার লেবার শেডের ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর পড়ে। এতে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এ সময় মারাত্মক আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর আরো একজনের মৃত্যু হয়।