সেন্ট মার্টিনে যেতে লাগবে অনলাইনে নিবন্ধন

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পর্যটকের উপস্থিতি দ্বীপটিকে পরিবেশগত ঝুঁকিতে ফেলছে। তাই এখন থেকে পর্যটকের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। এখন থেকে এই দ্বীপে যেতে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে।

কউক চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ আজ মঙ্গলবার বলেন, সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সেন্ট মার্টিনকে প্রাকৃতিক কাজে লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু এখন সেন্ট মার্টিনের অবস্থা বেহাল। প্রবাল-শৈবাল, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়েছে দ্বীপটি। এখন মাস্টারপ্ল্যান তৈরির মাধ্যমে প্রবালদ্বীপটি রক্ষার চেষ্টা চলছে।

ফোরকান আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে একটি নীতিমালা তৈরি হয়েছে। আগামী পর্যটন মৌসুম (ডিসেম্বর-এপ্রিল) থেকে এ নীতিমালা চালু হবে। তখন কতজন পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতে পারবেন, কতোজন থাকতে পারবেন, কতোটা জাহাজ চলাচল করতে পারবে, তার সবকিছু নির্দিষ্ট করা থাকবে।

৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনের লোকসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬ প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পরিযায়ী পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। এখন অনেক বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

অনলাইনে নিবন্ধন
পর্যটন মৌসুম শুরু হলে টেকনাফ থেকে ছয়-সাতটি প্রমোদতরি এবং ৩০টির বেশি কাঠের ট্রলারে সেন্ট মার্টিন যাওয়া-আসা করেন দৈনিক ১৫ হাজার পর্যটক। আগামী মৌসুম থেকে সেই সুযোগ আর থাকছে না। তখন সেন্ট মার্টিনে যেতে হলে অনলাইনে নিবন্ধন লাগবে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো ব্যক্তি সেন্ট মার্টিনে গেলে শাস্তি কিংবা অর্থদণ্ড হবে। এর লক্ষ্যে একটি সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে।

এর সত্যতা নিশ্চিত করে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। চলতি মৌসুমে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে গিয়েছেন। আগামী মৌসুম থেকে যেতে পারবেন ১ হাজার ২৫০ জন করে। এর মধ্য থেকে কতজন দ্বীপে রাত যাপন করতে পারবেন, তা–ও নীতিমালায় নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে।

১৬ এপ্রিল কক্সবাজার সৈকতের একটি তারকা হোটেলে ‘কক্সবাজারের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক এক সেমিনারের আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেমিনারে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুলতান আহমদ বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রতিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্বীপকে রক্ষার জন্য বিপুলসংখ্যক পর্যটকের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আগামী মৌসুম থেকে দৈনিক ১ হাজার ২৫০ জন পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতে পারবেন। সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে ইচ্ছুকদের আগে থেকে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে।

সভায় বক্তব্য দেন- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (মানবসম্পদ উন্নয়ন) এস এম সরওয়ার কামাল, কউক সদস্য লে. কর্নেল আনোয়ার উল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবেদিল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হক, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের, কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা প্রমুখ। বক্তারা সবাই সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর লক্ষ্যে দ্রুত নীতিমালা কার্যকরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংকটে প্রবালদ্বীপ
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বীপের প্রবাল, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্য প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দ্বীপের ১০৬টি হোটেলের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জল। আর সৈকতে কোলাহল বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর সমুদ্র থেকে ছুটে আসা মা কচ্ছপও ডিম দিতে পারছে না।

গত অক্টোবর থেকে সেন্ট মার্টিন-টেকনাফ নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়। চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। গতকালও কেয়ারী সিন্দাবাদ জাহাজে করে সেন্ট মার্টিনে গেছেন দুই শতাধিক পর্যটক। ৩০ এপ্রিলের পর এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে কয়েক মাস। কারণ, এ সময় সমুদ্র উত্তাল থাকে। জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হবে নতুন মৌসুম শুরুর অক্টোবরে।

দেখা গেছে, বেশির ভাগ পর্যটক দ্বীপের ১০৬টি হোটেল-কটেজে থাকেন। কোনো হোটেলে পয়োবর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। হোটেলের বর্জ্য চলে যাচ্ছে সমুদ্রে। এতে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জল ঘোলাটে হচ্ছে। প্রমোদতরির ইঞ্জিনের পাখার (প্রপেলার) কারণে সমুদ্রের তলদেশের বালু পানিতে মিশে প্রবালের ওপর জমে আস্তরের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিশাল প্রবাল এলাকা মরে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি সেন্ট মার্টিনের তিন দিকের প্রবাল আস্তর থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, নৌকার মাছ ধরার জাল, প্লাস্টিক বোতল, ক্যান ও সিগারেটের উচ্ছিষ্ট উদ্ধার করেছেন। দ্বীপের তিন দিকের কয়েকশ একর প্রবাল এলাকায় বালুর আস্তর জমে থাকতে দেখেছেন তাঁরা। এ ছাড়া সৈকত থেকে শামুক-ঝিনুক আহরণ চলছেই।

লোকসমাগমের কারণে গভীর সমুদ্র থেকে ডিম পাড়তে আসা ক্লান্ত ও দুর্বল মা কচ্ছপগুলো সৈকতে উঠতে পারছে না। ক্রমান্বয়ে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫৯০ হেক্টর আয়তনের ৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটারের এই প্রবালদ্বীপে অতিরিক্ত মানুষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে দ্বীপের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। এ কারণে শতাধিক নলকূপে লবণ পানি ঢুকে গেছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দ্বীপের সাত হাজার মানুষ পানীয় জলের সংকটে পড়ে। নলকূপ ও পুকুরের লবণযুক্ত পানি খেয়ে অনেকে ডায়রিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, গত ১ মার্চ থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু বিশেষ কারণে তা কার্যকর হয়নি। তবে আগামী মৌসুম থেকে রাতযাপনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞাসহ সেন্ট মার্টিনকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সেন্ট মার্টিন হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ‘দ্বীপ ভ্রমণে আসা পর্যটকদের আমরা সচেতন করছি। তাই প্রবাল, শামুক-ঝিনুক আহরণ অনেক কমে গেছে। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি উদ্যোগ দরকার।’

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, সেন্ট মার্টিনকে রক্ষার বিষয়ে টুয়াক দ্বীপে সচেতনতামূলক কাজ করছে। অতিরিক্ত লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কাঠের বোট চলাচল বন্ধ করতে হবে। সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে পুরো কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের প্রভাব পড়বে। তখন ৪০ হাজার পরিবার বেকার হয়ে পড়বে।

সেন্ট মার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, পর্যটনের ওপর দ্বীপের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। এ জন্য একটা নীতিমালা তৈরি দরকার। যে নীতিমালার আলোকে দ্বীপ রক্ষা পাবে, বাঁচবে মানুষ।