নুসরাত হত্যা: নূর ও শামীমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ছবি: সংগৃহীত।

ফেনী সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন এজহারভুক্ত দুই আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। এই দুই আসামি গতকাল রোববার (১৪ এপ্রিল) মধ্যরাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাহেরুল হক চৌহান এ তথ্য জানান।

রোববার বিকাল ৩টায় নূর ও শামীমকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর তাদের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেন বিচারক, তা চলে রাত ১টা পর্যন্ত।

তাহেরুল হক চৌহান বলেন, আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জবানবন্দি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। আসামি দুজন আদালতের কাছে তাদের স্বীকারোক্তি উপস্থাপন করেন।

সেখানে তারা পুরো ঘটনা স্পষ্ট করেছেন জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তারা কারাগারে থাকা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কাছ থেকে হুকুম পেয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। এ সময় তাদের সঙ্গে কারা ছিলো, কীভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, বিষয়গুলো জবানবন্দিতে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা এখনই গণমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে না।

সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন নুসরাত। গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেপ্তার করেছিলো পুলিশ। ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় বোরখা পরা চারজন। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান। দুই বছর আগে দাখিল পরীক্ষার সময়ও আক্রান্ত হয়েছিলেন নুসরাত। তখন তার চোখে দাহ্য পদার্থ ছুড়ে মারা হয়েছিলো। ওই ঘটনাতেও অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ‘ঘনিষ্ঠ’ নূর উদ্দিনকে সন্দেহ করা হয়।

ফেনীর সোনাগাজীর উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের নূর উদ্দিনকে শুক্রবার ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। আর শাহাদাত হোসেন শামীমকে শুক্রবার সকালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় মোট ১৩ জন জড়িত ছিলেন, যাদের মধ্যে অন্তত দুইজন ছাত্রী। তাদের একজন অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি। আর মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার সময় বোরকা পরা যে চারজন ছিলেন, তাদের একজন শামীম বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

শামীম এক সময় প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নুসরাতকে, কিন্তু নুসরাত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানান বনজ কুমার। তিনি বলেন, তারা দুটি কারণে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে। এর একটি হচ্ছে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করে আলেম সমাজকে হেয় করা। আর অপরটি হচ্ছে শাহাদত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা।

নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয় আসামি এবং এজাহারবহির্ভূত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১১ জন আসামি রিমান্ডে রয়েছেন। এর আগে গত ৯ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালত নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামের পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরদিন ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলাকে সাতদিন, আবছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক। ১১ এপ্রিল উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনকে পাঁচদিন করে রিমান্ড দেন একই আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ।

গত ১৩ এপ্রিল শনিবার মামলার আরেক আসামি জাবেদ হোসেনকে সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন।

গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় আইসিইউতেই মারা যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। পরদিন জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসাছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে এমন সংবাদে তিনি ছাদে যান। সেখানে বোরকাপরা চার-পাঁচজন তাকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।