নুসরাত হত্যা: মাকসুদ আলম পাঁচ দিনের রিমান্ডে

ফেনী সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনায় গ্রেপ্তার সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাকসুদ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ সোমবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমদ এ আদেশ দেন। এ নিয়ে এ মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, মাকসুদ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ১০ দিনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। বিচারক পাঁচ দিনের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। মাকসুদ আলমকে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়।

নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয় আসামি ছাড়াও আরো সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ৯ এপ্রিল জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহম্মেদের আদালত নূর হোসেন, কেফায়াত উল্যাহ, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শহিদুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন। ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে সাত দিন এবং আবছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন একই আদালতের বিচারক। পরের দিন ১১ এপ্রিল উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ১৩ এপ্রিল জাবেদ হোসেনকে সাত দিনের রিমান্ড দেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাঁকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত।

এর আগে ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। যৌন নিপীড়নের ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান। এ ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো চার-পাঁচ জনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই নোমান মামলা দায়ের করেন।

মাকসুদ আলম সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। নুসরাতের মৃত্যুর দুদিন পর গত ১২ এপ্রিল তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয় জেলা আওয়ামী লীগ।

এদিকে দুপুরে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আইনজীবীরা।

পরে বিকালে শহরের ট্রাংক রোডের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনারে একই দাবিতে মানববন্ধন হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সেখানে বক্তব্য রাখেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, সিপিবির সভাপতি ফয়জুল হক মিলকি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ফেনীর সাধারণ সম্পাদক সমর দেবনাথ, সাংস্কৃতিক সংগঠন পায়রা-এর সভাপতি জাহিদ হোসেন বাবলুসহ অনেকে। এর আগে সকালে ‘সচেতন ছাত্র সমাজ’, ‘মাল্টিসফট আইটি’, ‘গ্রান্ড হক টাওয়ার ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠন’-এর নেতাকর্মীরা নুসরাতের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করেন।

এদিকে নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে সোনাগাজী বাজারের জিরো পয়েন্টে একাধিক সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। প্রতিটি মানববন্ধনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে রোববার রাতে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার এজহারভুক্ত দুই ও তিন নম্বর আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। রোববার মধ্যরাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে ১৬৪ ধারায় দুজন জবানবন্দি দেন। দুপুর ৩টায় আদালতে হাজির করা হয় এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান দুই সন্দেহভাজনকে। এরপর দুজনের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়ে টানা ১০ ঘণ্টা (রাত ১টা) পর্যন্ত চলে।