ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার হবে: তুরিন আফরোজ

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। ফাইল ফটো

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ে সবচেয়ে সাহসী ও আলোচিত মুখ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সফলতার পর তিনি এখন কী ভাবছেন তা জানতেই যোগাযোগ করা হয়েছিলো তাঁর সঙ্গে। সেই সাক্ষাতকারটি এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে সফল হলেন। এবার কী ভাবছেন ?
তুরিন আফরোজ: আমাদের এবারের দাবি ভুঁয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির আমলে প্রায় ২২ হাজার ভুঁয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে সাড়ে ১১ হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন বাঙালি জাতির সূর্যসন্তান। মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি আমাদের কাছে অনেক বড় মাহাত্ম্যময়। সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও অপমান করা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ঠিক তেমনি যদি একজন ভুঁয়া মুক্তিযোদ্ধাও থাকে, তারা যদি সমান সম্মান দাবি করে, সেটা হবে দেশ জাতির সঙ্গে প্রতারণা। সকল শহীদের সঙ্গে প্রতারণা। সুতরাং আমাদের এখানে কেনো ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকবে?

প্রশ্ন: মহান মুক্তিযুদ্ধের এতো বছর পরও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে কেনো? এটার জন্য দায়ী কে?
তুরিন আফরোজ: দায়ী হচ্ছে আমাদের প্রক্রিয়া। মুক্তিযোদ্ধা নিবন্ধীকরণের বা অন্তর্ভুক্তিকরণের যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়া এবং মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির সংজ্ঞায়ন মোট ১২ বার (সংশোধনীসহ) করা হয়েছে।

সর্বশেষ কয়েকদিন আগেও করা হলো। প্রশ্ন হলো, আমরা এতোবার কেনো সংজ্ঞায়ন করছি। ১৯৭২ সালে কিন্তু একটি আদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ন করেছিলেন। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারে। অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিন্তু সবাইকে এক কাতারে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ফেলা তো মেনে নেওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতীয় প্রয়োজনে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা খেতাব আমরা চেয়েছি। তারাও কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই যে সংজ্ঞায়ন নিয়ে ১২ দফা পার হলাম, এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা নিজেরা নিজেদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা সনাক্ত করছেন। কিন্তু এটি একটি করাপট্ সিস্টেম (দুর্নীতিপ্রবণ পদ্ধতি)। একজন কমান্ডার কাউকে সনদ দিলেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছেন এবং নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। এর ফলে দুর্নীতির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। তাই এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ নয়।

প্রশ্ন: এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কী বলবেন?
তুরিন আফরোজ: অবশ্যই, প্রভাব থাকে। নীলফামারী-৩ আসনের সাংসদ একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর এলাকার কমান্ডার ছয়টি মিডিয়াতে লাইভ সম্প্রচারে বলেছেন, এই সাংসদ কখনো মুক্তিযুদ্ধ করেননি। যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ১২ বছর।

এই সাংসদ ২০০৭ সালে নিজে বলেছেন, “আমি যদি মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ করতে পারতাম, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।”

কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, ওই কমান্ডার ছয়টি মিডিয়াতে কথা বলার ১৫ দিনের মাথায় বলছেন, “না, ওই সাংসদ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যুদ্ধ করেছেন।”

প্রশ্ন হচ্ছে ১৫ দিনের মাথায় যদি মুক্তিযোদ্ধা বানানো যায়, তাহলে কতোখানি টাকার খেলা হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে একটা শ্রেণি বাণিজ্যিকীকরণ করছে এবং আমরাই সেই সুযোগ দিচ্ছি।

আমার হাতে একটা মামলা আছে। এক রাজাকার মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে, বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আহত হলেন। তিনি নভেম্বরের দিকে কলকাতায় গেলেন চিকিৎসা করাতে।

দেশ স্বাধীন হলো। তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দেশে ফিরলেন। বর্তমানে তিনি আসীন আছেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে। এখন এই কমান্ডার কাকে রিকমান্ড (সুপারিশ) করবেন আর কাকে যাচাই বাছাই করবেন? এই কমান্ডারদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ কী আমরা নিতে পেরেছি? পারিনি।

আমাদের সোজাসাপ্টা দাবি, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের প্রক্রিয়ায় গলদ রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে বা সংশ্লিষ্ট মহল থেকে কেনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?

যেখানে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিজেই দুর্নীতিবাজ, নিজেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, সেখানে কেনো তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন (ব্যবস্থা) নেওয়া হচ্ছে না?

প্রশ্ন: এসবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা কী আইনে আছে?
তুরিন আফরোজ: অবশ্যই আইনে আছে। আমাদের প্যানাল কোডে বিভিন্ন ধারায় আছে, কেউ যদি নিজেকে ভুল পরিচয় বা অন্য পরিচয় দেয়, সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ। এটা ৪১৬ ধারা। আমি যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিচ্ছি, সেটি অপরাধ করছি।

৪১৯ এর অধীনে কমপক্ষে ৩ বছর জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। ৪৭১, ৪৬৩- এর বিভিন্ন সেকশনে (ধারা) এই অপরাধের রায় পাবেন। কেউ যদি ভুয়া সনদ বা জাল দলিল তৈরি করে ( এটাও একটা জাল দলিল) সেখানে দুই বছর পর্যন্ত জেল হওয়ার বিধান আছে।

প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে যদি কোনো কাজ করা হয়, এটা তো প্রতারণাই- ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রদর্শন করে আপনি ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেবেন- তার মানে আপনি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি চুরি করছেন। রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এর শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত জেল। ১৯৮ ধারায় মিথ্যা সনদ দিয়ে সুবিধা নিলে তিন থেকে সাত বছরের জেল হতে পারে।

প্যানাল কোডের অধীনে/আইনের অধীনে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যেমন: একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তার অধিকার হরণ হচ্ছে বলে উচ্চ আদালতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে রিট করতে পারেন।

অনুচ্ছেদ ৩১- এ আছে, আমার মৌলিক অধিকারের একটি হচ্ছে আমার সুনাম ক্ষুন্ন না হওয়া। একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কারণে সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সম্মানহানী হতে পারে।

প্রশ্ন: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির ক্ষেত্রে অনেক সময় সিন্ডিকেট কাজ করে।
তুরিন আফরোজ: অনেক সময় না, সব সময়। সিন্ডিকেট সব সময় কাজ করে। যে কমান্ডার কমান্ড করছেন বা ইস্যু করছেন, যে বা যারা প্রভাব বিস্তার করছেন, যারা সহযোগিতা করছেন সকলকে বর্তমান আইনের আওতায় আনা সম্ভব।

প্রশ্ন: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, যারা মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও প্রতারণা করছেন, তাদের সন্তানেরা সব ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছেন। তাদের ব্যাপারে কী বলবেন?
তুরিন আফরোজ: দেখুন, যে ফ্যামিলিতে শহীদ হয়েছেন, সে ফ্যামিলিগুলো উঠে আসতে পারেনি।

অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা রিক্সা চালাচ্ছেন। যারা একসময় অস্ত্র হাতে অনিশ্চয়তার পথে (কারণ তারা তো জানতেন না যে ৯ মাসে দেশ স্বাধীন হবে) যুদ্ধ করেছিলো তাদের অনেকে এখনো ভিক্ষা করেন। তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি।

সেখানে যদি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সে সুযোগ নেয় তা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। ভালো একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ বা ভালো নাগরিক হওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়া আবশ্যক না। কিন্তু একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোনোদিনও ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নাগরিক, রাজনীতিবিদ হওয়া সম্ভব না। তার সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

সে তো প্রতারক। তাকে বা তার সন্তানকে কেনো সুবিধা দেয়া হবে? সে যেসব সুবিধা পাচ্ছে সেটা আমার আপনার টাকা। আমরা যে কর দেই সেই টাকা। সেই করের টাকায় কেনো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা সুবিধা নেবে? তার সন্তানেরা কেনো সুবিধা পাবে?

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও যারা চাকরি করছেন, প্রমাণ হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা উচিত। যেসব সুবিধা তারা নিয়েছেন, তা ফেরত নেওয়া উচিত। তাদের ওপর যে অর্থ জরিমানাসহ যে দন্ড আছে তা দেয়া উচিত।

প্রশ্ন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ইতোমধ্যে অনেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে ভাতাসহ নানা উপায়ে প্রচুর আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। সেক্ষেত্রে কী করা উচিত?
তুরিন আফরোজ: সেসব অর্থ ফেরত নিতে হবে। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক আইনে সেটা সম্ভব। আপনি অবৈধভাবে সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তা ফেরত দিতে হবে না? সেটা তো আপনার না।

এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা করতে পারে। ফৌজদারী আইনের ক্ষেত্রে পুলিশ বাদী হতে পারে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল হতে পারে।

প্রশ্ন: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্তিতে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের ব্যাপারে আইন কী বলে?
তুরিন আফরোজ: কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। সবাই সমান। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সমান সুযোগ সুবিধা পাবেন।” তাহলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন তারা অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই আইনের মাধ্যমে সেটা সম্ভব।

প্রশ্ন: ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্তকরণে কী কোনো প্রস্তাব করবেন?
তুরিন আফরোজ: যাচাই বাছাই প্রক্রিয়াটা যদি স্বচ্ছ রাখতে হয় সে ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। যা হবে প্রকাশ্যে। সাংবাদিকরা চাইলে বসে শুনবেন। গোপনে হবে কেনো? পেছনের দরজা দিয়ে কেনো মুক্তিযোদ্ধা তৈরি হবে? সূত্র: একুশে টেলিভিশন অনলাইন।