বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ কার্যক্রম: পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ-২

BIWTA logo

* আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী, তাই মুজিবরকে দিয়ে এসব করানো হচ্ছে: আবুল

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মচারিদের মধ্যে বেশ কিছুদিন যাবৎ এক ধরনের চাপা অসন্তোষ চললেও এখন তা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট (সিবিএ) নেতাদের বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মারাত্মক নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারিদের মাঝে নেতাদের যেমন ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে, তেমনি অনেক কর্মকর্তাও বিব্রতবোধ করছেন। আর সর্বস্তরের কর্মচারিদের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা ও অসন্তোষ দানা বেধে উঠছে। একপক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করছেন। সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এবং নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সিবিএ নেতারা বলছেন, তদন্ত হলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সার্বিক বিষয়ের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এবং অজানা অনেক তথ্য নিয়ে কয়েক কিস্তির ধারাবাহিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে পিটিবিনিউজবিডি.কম। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় কিস্তি।

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজবিডি.কম
বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ (বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারি ইউনিয়ন) নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ গত দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসলেও সম্প্রতি তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সংগঠনের সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কার্যক্রম বন্ধ করে অবিলম্বে সিবিএ নির্বাচনের অনুরোধ জানিয়ে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

নৌ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগকারী হলেন নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের মেডিকেল এ্যাটেন্ডেন্ট মুজিবুর রহমান; যিনি সিবিএর কেউ নন। বর্তমান সিবিএ নেতাদের কয়েকজনের ভাষায় তিনি ‘মামলাবাজ মুজিবর’ নামে পরিচিত। একই ব্যক্তি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে মামলা করেছেন। বিআইডব্লিউটিএ-তে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির জন্য কতিপয় কর্মকর্তা তাকে অর্থের যোগান দিয়ে এসব মামলা করান বলে সিবিএ নেতাদের অভিযোগ। সিবিএ নেতাদের আরো অভিযোগ, তাঁদের সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁরা সকলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হওয়ায় বিএনপি-জামাতপন্থীদের চক্রান্তে ও সহায়তায় মুজিবর এসব করছেন। বিআইডব্লিউটিএর ওষুধ চুরির অভিযোগে তাঁকে কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন বলেও সিবিএ নেতারা অভিযোগ করেন।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পিটিবিনিউজবিডি.কমের অনুসন্ধানে জানা যায়, মুজিবর রহমান বছর দুয়েক আগে বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারি ইউনিয়নের (নিবন্ধন নং বি-২১৭৬) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন; যা কয়েকটি বেঞ্চ ঘুরে এখন বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে চূড়ান্ত আদেশের অপেক্ষায় আছে।

এছাড়া আরো দুটি মামলা করেছেন মুজিবর রহমান। এর একটি হলো নিজেকে বিআইডব্লিউটিএ এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (নিবন্ধন নং বি-১৪৪০) সাধারণ সম্পাদক দাবি করে এই সংগঠনের বৈধতা চেয়ে শ্রম আদালতে। অন্যটি বিআইডব্লিউটিএ ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুরের অভিযোগে ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে; যাতে প্রধান আসামি করা হয় সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেনকে।

এভাবে একই ব্যক্তি একের পর এক মামলা দায়ের করে চলেছেন; যেখানে মূল প্রতিপক্ষ অভিন্ন। ফলে বিআইডব্লিউটিএর কর্মচারিদের একাংশের কাছে তিনি সমালোচিত হচ্ছেন। আর এ সুযোগে বিবাদীপক্ষ তাঁকে মামলাবাজ বলার সুযোগ পাচ্ছেন।

যদিও পিটিবিনিউজবিডি.কমের সঙ্গে আলাপকালে নৌ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়েরসহ প্রত্যেকটি মামলা করার পক্ষে শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করেছেন মুজিবর রহমান। এছাড়া ওষুধ চুরির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান (তৎকালীন) কমডোর এম মোজাম্মেল হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে মুজিবর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ওই আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়, বিআইডব্লিউটিএর চিকিৎসা শাখা, নারায়ণগঞ্জের স্টকে থাকা ওষুধের মধ্যে ১৫টি আইটেম কম পাওয়া গেছে; যা আত্মসাতের সামিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুজিবর রহমান পিটিবিনিউজবিডি.কমকে বলেন, “অভিযোগ সত্যি হলে তো এতোদিন আমার চাকরি থাকার কথা না। সিবিএ নেতারা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান মহোদয়কে ভুল বুঝিয়ে আমাকে সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) করিয়েছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাঁদের মিথ্যা অভিযোগ ধোপে টেকেনি, কেউ বিশ্বাসও করেননি।”।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কার্যক্রম বন্ধ করে অবিলম্বে সিবিএ নির্বাচনের অনুরোধ জানিয়ে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানকে বর্তমান সিবিএর তিন নেতা চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন সাংগঠনিক সম্পাদক পান্না বিশ্বাস, দপ্তর সম্পাদক তুষার কান্তি বণিক ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম। গত ২৪ জানুয়ারি এই চিঠি দেন তাঁরা। যদিও এর কয়েকদিনের মাথায় পান্না বিশ্বাস ও শহীদুল ইসলাম শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দেয়া পাল্টা এক চিঠিতে আগের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।

তবে এর তিনদিন পর শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে তৃতীয়বারের মতো আরেকটি চিঠি দেন শহীদুল ইসলাম। সেই চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্বিতীয় চিঠিতে স্বাক্ষর আদায় করা হয়েছে। (চলবে)….।

[সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে নৌ মন্ত্রণালয়ে করা মুজিবর রহমানের অভিযোগে কী বলা হয়েছে, সিবিএর অন্য নেতাদের বাদ রেখে শুধুমাত্র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে কেনো এই অভিযোগ, এসব অভিযোগের সত্যতা কতোটুকু, মুজিবর কী আদৌ বিএনপি-জামাত সমর্থক, তিনি কী একা নাকি সিবিএর নেতৃত্ব প্রত্যাশী অন্যরাও তাঁর পেছনে আছেন, সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক- দু’জনই কী আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী- এসব চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য জানতে চোখ রাখুন পিটিবিনিউজবিডি.কম এর সঙ্গে]।