শিশুটি কী পাপ করেছিল?: মাসুদ খান

মাসুদ খান: ছবি ফেসবকু থেকে নেওয়া

ক্লিনিকের ঠিক পেছন দিকটায়, লেকের পাড় ঘেঁসে চলাচলের জন্য সরু একটা পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। মুলতঃ স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা সকাল সন্ধ্যায় এই রাস্তা দিয়ে হাটাচলা করে থাকেন। দিনের বাদবাকি সময়টাতে এই নির্জন জায়গাটা ভবঘুরে, নেশাখোর ও বেওয়ারিশ কুকুরের একান্ত বিশ্রামাগারে পরিনত হয়। এ সময়টাতে সহজে কেউ এ পথটা মাড়ায় না।

সেই রাস্তার পাশ ঘেঁষে লতানো গাছের ছোট একটা ঝোপ বেড়ে উঠেছে। আর সেই ঝোপের আড়ালে রাতের অন্ধকারে তাকে ফেলে যাওয়া হয়েছে ব্যবহারিত একটা কার্টুনের ভেতরে পুরে। ছোট্ট শরীরটাকে পুরোনো কাপড় এবং ওড়না দিয়ে বেশ শক্ত করে পেঁচানো হয়েছে।

এই বিশাল পৃথিবীতে তার আগমন বারো ঘন্টাও পার হয়নি, অথচ এরই মধ্যে তাকে এই পৃথিবী ও তার সৃষ্টির সেরা জীবদের কাছ থেকে নিষ্ঠুরতম আচরণ সহ্য করতে হয়েছে কোনো অপরাধ না করা সত্বেও। যে মুহূর্তগুলোতে তার থাকার কথা ছিলো মায়ের বুকের উষ্ণতার মাঝে, অনাবিল আদর আর স্নেহের পরশে, অথচ তাকে একাকী রাত কাটাতে হয়েছে পরিত্যক্ত একটি কাগজের বাক্সে, অন্ধকার বিপদশংকুল এক উন্মুক্ত রাস্তার কিনারে।

পাতলা দুটি ঠোঁট ও চোখের পাতা এখনো নীলবর্ণ হয়ে আছে। সম্ভবত, জন্মের পরপরই সে মারাত্মক ভাবে অক্সিজেনের অভাবে ভুগেছে। অথচ, কি অবলীলায় এসব নিষ্ঠুরতাকে ভুলে প্রশান্ত হাসি মাখা মুখ নিয়ে সবার পানে সে তাকিয়ে আছে।
সকালে যখন তার সাথে দেখা হলো, তখন আর সে একা নেই। এই বিশ্মভ্রমান্ডের একটা ধুলিকনাও যার হুকুম ছাড়া এক বিন্দু স্থানচ্যুত হয় না, সেই তারই ইচ্ছায় সৌরজগতের সবচাইতে প্রখর ও শক্তিশালী গ্রহটি তারজন্য অতি প্রয়োজনীয় আলো ও তাপ নিয়ে এসেছে ততক্ষণে..!

হয়তো ভবিষ্যতে তার জীবনের গল্প আরো অনেক মিরাকল দিয়ে লেখা হবে, নতুবা কিছুই নয়! শ্রেফ মুছে যাবে সবার অজান্তে আরো অনেক নাম না জানা ফুলের মতই…….!

বাস্তবে তার কি হবে আসলেই জানি না, তবে পরের দৃশ্যগুলো আমরা একটু দ্রুত কল্পনা করে নিতে পারি….. (নিজেকে আমি একজন পজেটিভ মানুষ হিসেবে মনে করি, তাই আমার কল্পনা গুলোও স্বভাবতই পজেটিভ হবে……….!)

শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত শিশুটির আশ্রয় একটা অনাথ আশ্রমে হলো। প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও সেবাযত্নে সে যাত্রা সে টিকেও গেল।

তার বয়স যখন দু বছরের কাছাকাছি, তখন নেদারল্যান্ডসের এক নিঃসন্তান দম্পতি তাকে দত্তক গ্রহন করে নিজ দেশে নিয়ে গেল। সেখানে সে বেড়ে উঠলো অন্য আর সমস্ত ইউরোপিয়ান সন্তানদের মত করেই। বাবামায়ের স্নেহ, ভালোবাসার কোনো কমতিই তার রইলো না। শিক্ষাদীক্ষা, প্রয়োজন, অধিকার, সবকিছুরই যথাযথ প্রাপ্তিলাভ হলো। কুড়ি বছর পূর্বে জন্মের সেই কালো অধ্যায়ের কোনো স্মৃতিচিন্হই তার কোথাও আর রইলো না…..।

জীবনের শেষ সময়ে এসে আদর্শ পিতামাতার মতোই তারা একদিন তাদের সন্তানকে তার শেকড়ের উত্স প্রকাশ করে দিলেন। ইউরোপিয়ান পরিবেশের শক্ত মন-মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা মেয়েদের মতোই সে এটা সহজ ভাবে গ্রহন করলো এবং দৃশ্যতঃ এতে তার স্বাভাবিক জীবন যাপনে কোনো ছন্দপতনও হলো না।
কিন্তু কোনো এক প্রবল তুষার ঝরা রাতে তার রক্ত কণিকায় জড়িয়ে থাকা সেই শেকড়ের ঘ্রাণ তার আত্ম-প্রতিরোধের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিলো। সে রাতে তার কাছে এই সুখশান্তি, প্রাচুর্য ও নিশ্চিত জীবনকে একেবারে অর্থহীন মনে হলো……!

পরবর্তী দু মাসের মাথায় সে সহসা হাজির হলো ঢাকার সেই অনাথ আশ্রমে। পুরনো কাগজপত্র ঘেটে, আর আশ্রমের পুরানো কর্মচারীদের একান্ত সহযোগিতায় তার সম্ভাব্য জন্মের স্থানকে চিন্হিত করা গেলো।

তারপর এক মাসের বেশি সময় ধরে বিদেশি মেয়েটি তার জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজে ঢাকার অলিগলি পথ-প্রান্তর পাগলের মত চষে ফেললো। কিন্তু কোনো কুলকিনারা হলো না……।

অবশেষে, সে অদ্ভুত একটা কান্ড করে বসলো। বেশ বড়সড় একটা প্ল্যাকার্ডে কিছু একটা লিখে সেই ক্লিনিকের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেলো, প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলো –

“I borned here on the date of………and I was forcefully snatched from my mom & thrown onto the street on the day I borned.

Now, I came back here to see my mom, even if it is for a moment only…….!”

মাসুদ খান: একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। লেখাটি তাঁর ফেসবুক থেকে হুবহু সংগৃহিত।