২০১৮: যেসব গুণীজনকে হারিয়েছে বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম
সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার স্মৃতি বিজড়িত ২০১৮ সাল আমাদের মধ্যে থেকে বিদায় নিয়েছে। ফেলে আসা বছরে রাজনীতি, মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক ও শিক্ষা-সাহিত্য অঙ্গনের অনেক গুণীজনকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য সামনের দিনেও যাদের স্মরণ করবে বাংলাদেশ- এমন কয়েকজনের কথা তুলে ধরা হলো।

ধীরাজ কুমার নাথ
বছরের শুরুতে ৫ জানুয়ারি মারা যান সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায় সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ধীরাজ কুমার নাথ। তার বয়স হয়েছিলো ৭৩ বছর।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব থাকা অবস্থায় ২০০৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান ধীরাজ কুমার নাথ। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হন তিনি।

১৯৪৫ সালের ৯ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করা ধীরাজ ১৯৬৯ সালে পুর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগে সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োজিত হন ধীরাজ। গাজীপুরের প্রথম মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই সরকারি কর্মকর্তা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপসচিব (সমন্বয়) এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদেও দায়িত্ব পালন করেন।

ধীরাজ কুমার নাথ সম্পাদিত ১২টি বই রয়েছে, যার মধ্যে ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ সংগ্রহ, উপন্যাস রয়েছে।

মোহাম্মদ নবী
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের যোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ নবী মারা যান ১৪ জানুয়ারি। মোহাম্মদ নবীর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। এছাড়া তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান।

কথা সাহিত্যিক শওকত আলী
দীর্ঘ রোগভোগের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কথাসাহিত্যিক শওকত আলী মারা যান ২৫ জানুয়ারি। ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার থানা শহর রায়গঞ্জে জন্ম নেন শওকত আলী।

ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতিতে জড়ানো শওকত আলী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাকে বন্দি করে জেলে পাঠায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা।

পরে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও কিছুদিন পরে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। বামপন্থিদের ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল, ইত্তেফাকে তার অনেক গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

শওকত আলী তার ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনামল, দেশভাগ আর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মর্মন্তুদ ছবি এঁকেছেন। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-উপন্যাসে তিনি নিম্নবর্গের মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে এনেছেন। পাশাপাশি ফুটিয়ে তুলেছেন শোষকের করাল গ্রাসের বিপরীতে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের বিপ্লব-বিদ্রোহের চিত্র।

‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ উপন্যাসত্রয়ীর জন্য শওকত আলী ‘ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার’ পান। কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯০ সালে পান একুশে পদক।

সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু
রংপুরের সাবেক মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু মারা যান ২৫ ফেব্রুয়ারি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে ২৬ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুর কাছে তিনি হার মানেন। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ঝন্টুর বয়স হয়েছিলো ৬৬ বছর।

২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু। ২০১৭ সালে ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে লড়লেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি।

রংপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা ঝন্টু রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম
ওরস্যালাইনের উদ্ভাবক রফিকুল ইসলাম মারা যান ৫ মার্চ। তার বয়স হয়েছিলো ৮২ বছর। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

১৯৩৬ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে রফিকুল ইসলামের জন্ম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন আইসিডিডিআর-এ যোগ দেন। ২০০০ সালে অবসরে যান। আইসিডিডিআর-বি তে থাকার দিনগুলোতে বেশ কিছু গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে ওরস্যালাইন অন্যতম।

১৯৭১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শরণার্থী কলেরা রোগে আক্রান্ত হন। তাদের বাঁচাতে ওরস্যালাইন ব্যবহার করে তিনি সাফল্য পান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তার উদ্ধাবনকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডা. রফিকুল ইসলামের ওরস্যালাইনকে স্বীকৃতি দেয়। দেশি এনজিও ব্র্যাক পরে ওরস্যালাইনকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়।ডায়রিয়ার হাত থেকে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব দেওয়া হয় খাবার স্যালাইনকে (ওআরএস)।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী
৬ মার্চ বাংলাদেশ হারায় রণাঙ্গনের বীর মাতা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে। কিডনি ও হৃদরোগের জটিলতা নিয়ে ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত এই মুক্তিযোদ্ধার বয়স হয়েছিলো ৭১ বছর।

১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জন্ম। তার নানা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সরকারের সময় স্পিকার হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় তরুণ প্রিয়ভাষিণীর অন্য এক লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হতে হয় এই বীর নারীকে।

১৯৭৭ সাল থেকে দুই দশকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পর এক সময় তিনি মন দেন শিল্পের সাধনায়। ঝরা পাতা, শুকনো ডাল, গাছের গুঁড়ি দিয়ে তার তৈরি গৃহসজ্জার উপকরণ ও শিল্পকর্ম তাকে ধীরে ধীরে করে তোলে ভাস্কর।

স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদানের জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেয়। তার আগে ২০১০ সালে তিনি পান স্বাধীনতা পুরস্কার। ২০১৪ সালে একুশের বইমেলায় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘নিন্দিত নন্দন’ প্রকাশিত হয়।

বীরপ্রতীক কাকন বিবি
এ বছর ২২ মার্চ বাংলাদেশ হারায় রণাঙ্গনের আরেক বীর সৈনিক বীরপ্রতীক নুরজাহান কাকন বিবিকে। হৃদরোগে আক্রান্ত শতবর্ষী কাকন বিবি সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

১৯১৫ সালে মেঘালয়ের নেত্রাই হাসিয়া পল্লীতে জন্মগ্রহণ করা কাকন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধরে নিয়ে গিয়ে বাঙ্কারে আটকে দিনের পর দিন নির্যাতন চালায় পাকিস্তানি সেনারা। ছাড়া পেয়ে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন কাকন বিবি। পরে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেন। টেংরাটিলা, আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূরবীণটিলা, আধারটিলাসহ নয়টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন কাকন বিবি।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে তাকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

আনোয়ারা বেগম
রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ এপ্রিল মারা যান সাবেক ফার্স্ট লেডি আনোয়ারা বেগম। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী। তার বয়স হয়েছিলো ৮৩ বছর।

আনোয়ারা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার সাবেক অধ্যাপক এবং বেসরকারি অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ছিলেন।

কবি বেলাল চৌধুরী
চলতি বছর ২৪ এপ্রিল বাংলার সাহিত্যাঙ্গন হারায় কবি বেলাল চৌধুরীকে। কিডনি জটিলতা, রক্তশূন্যতা ও থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু বাঁচানো যায়নি ৮০ বছর বয়সী বেলাল চৌধুরীকে।

একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক বেলাল চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৮ সালে ১২ নভেম্বর, ফেনীতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছাত্র অবস্থায় বেলাল জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার রাজনীতিতে, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাগারেও যান।

ষাট ও সত্তরের দশকে কয়েক বছর কলকাতায় বসবাসের সময় সাহিত্য পত্রিকা কৃত্তিবাস সম্পাদনায় যুক্ত হন তিনি। কলকাতা থেকে ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে বেলাল চৌধুরী যোগ দেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। সে সময়ে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও পদাবলী কবিতা সংগঠন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৪ সালে একুশে পদক পান কবি বেলাল চৌধুরী। এছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন স্বর্ণপদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম
গত ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ হারায় বাঙালির ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা অধ্যাপক মোস্তাফা নূর উল ইসলামকে। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুস্তাফা নুরউল ইসলামের জন্ম ১৯২৭ সালে ১ মে, বগুড়ায় । তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

ছাত্র বয়স থেকেই দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। পরে যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনে। ষাটের দশকের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের পর ৬১ তে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে তিনি পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, মুস্তাফা নুরউল ইসলাম তখন লন্ডনে পিএইচডি গবেষণা করছিলেন। প্রবাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

মুস্তাফা নূরউল ইসলামের কর্মজীবন শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে, ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা মুস্তাফা নূর উল ইসলাম জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউটেও নীতিনির্ধারণী পর্ষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের প্রবন্ধ-সঙ্কলন ও গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টির বেশি। ‘সুন্দরম’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন তিনি।

শুভ রহমান
সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভ রহমান মারা যান গত ১৪ মে। তার বয়স হয়েছিলো ৭৮ বছর। অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন শুভ রহমান। তার জন্ম ১৯৪০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চিনসুরা গ্রামে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষে ১৯৬৩ সালে তিনি ‘দৈনিক খবরের কাগজ’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। পরে বিভিন্ন সময়ে দৈনিক গণবাংলা, দৈনিক ইত্তেফাকে, দৈনিক বাংলা, দৈনিক জনকণ্ঠ ও সবশেষে তিনি কালের কণ্ঠে সাংবাদিকতা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলায় অবস্থান করছিলেন শুভ। সেখানে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। শুভ রহমান জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এবং বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। নিয়মিত কলাম লেখার পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন তিনি।

হালিমা খাতুন
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হালিমা খাতুনকে বাংলাদেশ হারায় গত ৩ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষকের বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর। হালিমা খাতুন ১৯৩৩ সালের ২৫ আগস্ট বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেন। তার বাবা মৌলবী আবদুর রহিম শেখ এবং মা দৌলতুন নেসা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হালিমা খাতুন জড়িয়ে পড়েছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে তিনিও রাষ্ট্রভাষার দাবিতে মিছিলে যোগ দেন। পরে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে তার সেই অবদানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি তাকে ‘ভাষা সৈনিক’ সম্মাননা দেয়।

মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা কল্পরঞ্জন চাকমা ২৫ জুলাই রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও টানা দুই বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য কল্পরঞ্জনের বয়স হয়েছিলো ১০০ বছর।

১৯৯৮ সালের ৬ মে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন সংসদে পাস হওয়ার পর ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান কল্পরঞ্জন চাকমা।

সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার
দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার ১৩ অগাস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ৭৫ বছর বয়সী এই সাংবাদিকের। একুশে পদকজয়ী গোলাম সারওয়ার দীর্ঘদিন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। এরপর দৈনিক যুগান্তরের মাধ্যমে সম্পাদক হিসেবে নাম লেখান তিনি।

১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্ম নেওয়া গোলাম সারওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে তার সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৬২ সালে। পরে ওই বছরই দৈনিক সংবাদে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার পর বানারীপাড়ায় ফিরে কয়েক মাস বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন গোলাম সারওয়ার।

১৯৭৩ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে; ব্যবসা সফল এই সংবাদপত্রের বার্তা সম্পাদক হওয়ার পর একাধারে ২৭ বছর সেই পদে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি ইত্তেফাক গ্রুপের সিনে ম্যাগাজিন পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৯৯ সালে যুগান্তরের সম্পাদক হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেন গোলাম সারওয়ার। ২০০৫ সালে সমকাল প্রকাশিত হয় তার হাত ধরে। মাঝে কিছু দিনের জন্য যুগান্তরে ফিরলেও পরে আবার ফিরে যান সমকালে।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার ২০১৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী
একাত্তরের বীর মাতা রমা চৌধুরীকে বাংলাদেশ হারায় গত ৯ সেপ্টেম্বর। রমা চৌধুরীর বয়স হয়েছিলো ৭৯ বছর। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা রমা ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পরে পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশু সন্তান নিয়ে বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। তার স্বামী চলে গেয়েছিলেন ভারতে। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয়, ধর্ষণের পর তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ওই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে মারা যান রমা চৌধুরীর দুই সন্তান সাগর (৫) ও টগর (৩)। তার আরেক সন্তান মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়।

রমা চৌধুরী ’৭১ এর জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’, ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’সহ ১৯টি বই লিখে গেছেন। চট্টগ্রাম নগরীতে খালি পায়ে বিচরণ করতেন এই বীরাঙ্গনা। নিজের লেখা বই নিজেই বিক্রি করতেন। বই বিক্রি করে একটি অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন ছিলো তার।

তরিকুল ইসলাম
বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম মারা যান ৪ নভেম্বর। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তার বয়স হয়েছিলে ৭২ বছর। ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোরে জন্ম নেওয়া তরিকুল ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর মওলানা ভাসানীর দলে যোগ দেয়ার পর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের ডাকে তিনি বিএনপিতে যান।

যশোর থেকে চার বার নির্বাচনে জিতে সংসদে যাওয়া তরিকুল চারদলীয় জোট সরকারের তথ্যমন্ত্রী এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি প্রথমে সমাজকল্যাণ এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত।

তারামন বিবি
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের প্রথম দিনই চিরবিদায় নেন একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট আর ডায়েবেটিসে ভুগছিলেন তিনি।

একাত্তরে কুড়িগ্রামের শংকর মাধবপুরে ১১ নম্বর সেক্টরে কমান্ডার আবু তাহেরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তারামন বিবি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা, তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, পাকিস্তানিদের খবর সংগ্রহের পাশাপাশি অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধেও তিনি অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তারামনকে বীর প্রতীক খেতাব দেয়।

১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের একজন গবেষক প্রথম তাকে খুঁজে বের করেন। নারী সংগঠনগুলো তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ওই বছর ১৯ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে তারামন বিবির হাতে সম্মাননা তুলে দেয়া হয়।