বাংলাদেশে নির্বাচনোত্তর ভয়ের সংস্কৃতি ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

সংখ্যালঘু নিপীড়ন। ফাইল ফটো

পিটিবিনিউজ.কম ডেস্ক:
চ্যানেল আই অনলাইনের একটি নিউজের শিরোনাম হচ্ছে: সংঘাত সহিংসতায় ম্লান প্রচার উৎসব। খবরটিতে বলা হয়, নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সৃষ্টি হয়। আর সেই উৎসবে বাধা হয়ে দাঁড়ায় দেশের বেশ কিছু জায়গায় সংঘটিত সহিংসতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘর্ষ ও সহিংসতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

তবে যে বিষয়টি সকলের নজর আকর্ষণ করে থাকে, তা হলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের নমুনায়ন। নির্বাচন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে সারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়ে থাকে। একটি পক্ষই রয়েছে যারা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে নির্বাচনোত্তর ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে চায়।

আমাদের সংবিধানে সংখ্যালঘু নামে কোন শব্দ নেই, তবে শব্দটি বহুল প্রচলিত ও ব্যবহৃত। শব্দটি একান্তই আমাদের নিজস্ব ঢঙে এবং উপস্থাপনের নিমিত্তে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশে সাধারণত সংখ্যালঘু বলতে হিন্দু সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়ে থাকে। তাছাড়া, বাংলাদেশে ধর্মীয় বাদে জাতিগত ও ভাষাগত উপায়েও সংখ্যালঘু নির্ণয় করা যায়। তথাপি নির্বাচনের প্রাক্কালে, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার জেরে সংখ্যালঘু বলতে হিন্দু সম্প্রদায় এবং দলিত সম্প্রদায়ের নিচু বংশের মানুষদের বোঝানো হয়ে থাকে। পাশাপাশি এ কথাও অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে, নির্বাচনের সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কোন না কোনভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে থাকে। নির্বাচনের মওসুম শুরুর দিকে রাজনৈতিক দলের নেতার সংখ্যালঘুদের অভয় দিয়ে থাকে নিরাপত্তার বিষয়ে। কিন্তু পট পরিবর্তনের সাথে সাথে সব কিছু কেমন যেন ওলট পালট হয়ে যায়।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা ঐতিহাসিক এবং ধারাবাহিকভাবেই রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন উপায়ে নির্যাতন, প্রহসন এবং বৈষম্যের স্বীকার হয়ে থাকে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং ভোট গ্রহণের পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর তাণ্ডব, জিঘাংসা, প্রহসন এবং ক্ষতির চিত্র গা শিউরে ওঠার মতোই। ২০১৪ সালের ৫ থেকে ১৯ জানুয়ারি সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর রাজনৈতিক কারণে ৮০টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

সংখ্যালঘু নিপীড়ন।ফাইল ফটো

সমগ্র বাংলাদেশে ৩১টি জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপরে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, পিরোজপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, নাটোর, বগুড়া, নেত্রকোণা, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, পটুয়াখালী, গাইবান্দা, লক্ষ্ণীপুর, যশোর, মৌলভীবাজার, নড়াইল, গাজীপুর, রংপুর, কুমিল্লা, জয়পুরহাট, শেরপুর এবং মাগুরা জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপরে রাজনৈতিক কারণে হামলা হয়ে থাকে। এসব হামলায় সংখ্যালঘুদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন, মানসিকভাবে চপেটাঘাত করা এবং আর্থিকভাবে (সম্পদ লুট করা) ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। এসব তথ্য উপাত্ত বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

হামলার ভয়াবহতায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়ের যে সংস্কৃতির সৃষ্টি হয় স্বাভাবিকভাবে তার নিরূপণ কোনভাবেই হয় না। পরিবার পরিজন নিয়ে সংখ্যালঘুরা ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করে থাকে। এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র যে, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে কোন সংকটের সৃষ্টি হলে তার জিঘাংসার রেশ সংখ্যালঘুদের ওপরেই বর্তায়।

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মাধ্যমে অপরাধীরা সমগ্র দেশে তাদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলশ্রুতিতে আতংক ও অস্থিরতা দেখা যায় জনমনে। বিশেষ করে নির্বাচনের মওসুমে অন্ধকারে থাকা মানুষগুলো সদলবলে পরিকল্পনা করে অরাজকতা সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করে থাকে। কিছু কিছু জায়গায় যে তারা সফল হয় না তা বলা যাবে না। তবে ওইসব এলাকায় মদদদাতারাও প্রত্যক্ষভাবে হামলা এবং জটিলতা উদ্ভবের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিপরীত ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু কিছু এলাকায় জনগণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে অপরাধীদের প্রচেষ্টাকে অপাঙক্তেয় করে দেওয়া হয়।

অপরাধী এবং সন্ত্রাসীরা সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে এবং আক্রমণ করে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত রাখার চেষ্টায় থাকে। অবশ্য এ সংক্রান্ত কাজে মদদদাতারা বেশ প্রভাবশালী হয়ে থাকে, বিভিন্নভাবে তারা অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়ে রাতের বেলায় যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে তখন ওঁৎ পেতে থাকা সমাজের ঘৃণ্য শ্রেণির লোকেরা পরিকল্পিত উপায়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ করে থাকে।

নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য সব দলের কাছেই সংখ্যালঘুরা অতি আপন হয়ে ওঠে।ফাইল ফটো

সাধারণত এরা বাড়িতে আগুন দেওয়া, বাড়ির পাশে খড়ের পালায়/গুদামে আগুন দেওয়া, মন্দিরে ভাংচুর করা, মন্দিরে চুরি করা, বাড়িতে ডাকাতি করা, নারী এবং শিশুদের ছুরির মাধ্যমে জিম্মি করা এবং বাড়িতে অবস্থানকারী বাসিন্দাদের আহত করা, দোকান লুট করা এবং আগুন দেওয়া, সংখ্যালঘুদের বাসস্থানের পাশে অবস্থিত সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা, মন্দিরের পাশে বোমা নিক্ষেপ করা, চাঁদা দাবি করা, ভয় দেখানো এবং ধর্ষণ করা ইত্যাদি ঘৃণ্য অপরাধ করে থাকে। সর্বোপরী, কালপ্রিটদের নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করাও নির্যাতনের অংশ। উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় এবং উপায়ে অপরাধীরা সংখ্যালঘুদের ক্ষতি করে থাকে এবং এদের পিছনে প্রভাবশালীদের ইন্ধন থাকে ঘনিষ্ঠভাবে। অপরাধ সংঘটনের প্রাক্কালে অপরাধীরা দেশী ও বিদেশী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়।

২৯ জানুয়ারি ২০১৪ সালে সাতক্ষীরার ২০টি হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ চিঠি দেওয়া হয় সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে। চিঠির ভাষা ছিলো এমন, শিগগির তোমাদের বাংলাদেশ ছেড়ে দিতে হবে এবং প্রথমে তোমাদের এ বিষয়ে ভদ্রভাবে বলা হলো। কিন্তু পরবর্তীতে অন্য কোন অজুহাত দাঁড় করানো যাবে না, তোমরা না গেলে তোমাদের যেতে বাধ্য করা হবে। ওই সময়ে নির্বাচনের পরে যশোরের মনিরামপুরে ২ জন হিন্দু মহিলাকে ধর্ষণ করা হয় (তাদের স্বামীদেরকে ঘরের বাইরে বেঁধে রাখা হয়)। স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপরে যে তাণ্ডবলীলা চালানো হয় তা বিবেকবান মানুষকে আঘাত দিয়ে থাকে। কিন্তু পাশবিক চরিত্রের অধিকারীদের মধ্যে কোনরূপ মানবিকতাবোধ নেই, আর যারা তাদের প্রতিপালন করে তাদের প্রতিও আমাদের ধিক্কার। ভোটের ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ পাশবিক চরিত্রের প্রতিপালনকারীদের কঠোর জবাব দিবে।

অন্য এক পরিসংখানে জানা যায়; ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ভূমি সংক্রান্ত ইস্যুতে সংখ্যালঘুদের ওপরে ৫৬৮টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ২৪৭টি আক্রমণ করা হয়েছে কেবলমাত্র মন্দিরে। কাজেই সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ও অত্যাচারের চিত্রায়ন বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুরা যে আক্রমণের শিকার হবে না এর কোন নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং, সে মর্মে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অন্যথায় এর সমাধান কোনভাবেই সম্ভবপর হবে না।

সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত কেন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিষদের নেতারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশে বারংবার সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। গুরুত্ব দিয়ে যদি ঘটনার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং বের করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করে শাস্তি দেওয়া যেতো তাহলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের প্রকট কমে আসবে না, যদি না তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতাদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি করা হয়। মদদদাতা এবং অপরাধীদের শাস্তির নিশ্চয়তাই পারে সংখ্যালঘুদের বারংবার নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সংখ্যালঘু নিপীড়ন।ফাইল ফটো

অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের মামলা পুলিশ গ্রহণ করতে চায় না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার মামলা গ্রহণ করলেও তদন্তের ধীরগতি মামলার সুষ্ঠু যাচাই বাছাইকরণে ব্যর্থতার মুখ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কিছু কিছু জায়গায় দেখা যায়, বিবাদীর কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে মামলার গতি ভিন্নপথে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এসব কারণগুলো মূলত সংখ্যালঘুদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে থাকে। আবার কিছু মামলায় দেখা যায়, অজ্ঞাতনামা আসামীর নামে পুলিশ থানায় মামলা করে থাকে, এ সংক্রান্ত মামলাও সহজে আলোর মুখ দেখে না।

পরিশেষে বলতে চাই, এ দেশটা আমাদের সকলের। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ অন্যান্য মতে বিশ্বাসীদের একত্রে বসবাস আমাদের বাংলাদেশে। মহান মুক্তিসংগ্রামসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও আমরা যাদের সংখ্যালঘু বলে চিহ্নিত করে থাকি তাদেরও যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় তাদেরকে হেয় করে বক্তব্য দিতে দায়িত্বশীলদেরও দেখা যায়। আমাদের মহান সংবিধানেও প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করেছে। কাজেই, একটা পক্ষকে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করে নির্যাতনের মুখে পদদলিত করা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। প্রত্যেক নাগরিক, মানবধিকার কর্মী, সমাজ সেবক, রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের যথাযথ ভূমিকাই পারে সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে। সৌজন্যে চ্যানেল আই অনলাইন।

মো. সাখাওয়াত হোসেন: প্রভাষক, ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়