দুটি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে অশুভ শক্তি: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ফাইল ছবি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
২০১৪ ও ২০১৫ সালে যে অশুভ শক্তি সাধারণ মানুষের ওপর আগুন–সন্ত্রাস চালিয়েছিলো, তারা আবার ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রাক্কালে দেশে সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্র করছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, লন্ডনভিত্তিক এক অপরাধীর বুদ্ধি-পরামর্শে এ অশুভ শক্তি দুটি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একটি হলো পুলিশের একটা অংশকে কিনে নেওয়া এবং অপরটি হলো কিছুসংখ্যক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে পুলিশ বাহিনীর মনোবল দুর্বল করা। আজ বৃহস্পতিবার (২০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় একদল সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে গণভবনে যান। সেখানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে আগুন–সন্ত্রাসীরা সফল হবে না। কেনোনা পুলিশ বাহিনী অধিকতর দক্ষতা ও দৃঢ়তা নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যকর সেবা ছাড়া আমরা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন করতে সক্ষম হতাম না।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের দুইটা পরিকল্পনা, এই পরিকল্পনাতো একটা ক্রিমিনাল আছে লন্ডনে, সে বসে বসে পাঠায়। একটা হচ্ছে পুলিশকে পয়সা দিয়ে হাত করা, আরেকটা হচ্ছে এদেরকে হত্যা করে এদের ডিমোরালাইজড করা, এই দ্বিমুখী পরিকল্পনা নিয়ে তারা এগোচ্ছে।

পাঁচ বছর আগে দশম সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের ওপর হামলা হয়। এরপর ওই নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ঘিরে ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস তাদের হরতাল-অবরোধে নাশকতায় মারা যান বহু মানুষ। এই ঘটনা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, খুনি, অগ্নিসন্ত্রাসী… ওরা পুলিশকে যেভাবে হত্যা করেছে, সেটা চিন্তাও করা যায় না। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা, পিটিয়ে পিটিয়ে মারা-এত জঘন্য কাজ তারা করতে পারে! এখনো শুনি, নির্বাচন সামনে রেখে নাকি তাদের মূল টার্গেটই হবে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কিছু মেরে ফেলে দেবে।

তবে এসব ‘ষড়যন্ত্র’ করে লাভ হবে না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার এই আত্মবিশ্বাস আছে, এখন তারা যেটা চিন্তা করে পুলিশ এখন সেটা না। এখন অনেক দক্ষতা অর্জন করেছে, অনেক আত্মবিশ্বাস পুলিশের মধ্যে ফিরে এসেছে।

পুলিশ তাদের ‘দায়িত্ব ও কর্তব্য কঠিনভাবে’ পালন করে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সেটা যদি তারা না করতো, সন্ত্রাস দমন আমরা করতে পারতাম না, এই জঙ্গিবাদ দমন আমরা করতে পারতাম না। আজকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা যে অভিযান চালিয়েছি, সেটাতে সফল হতে পারতাম না।

পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ‍ও বিশ্বাস তৈরি হয়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, যে কোনো দুর্যোগ আসলে মোকাবেলা করার মতো ক্ষমতা আমাদের আছে। মানুষের সচেতনতাও যথেষ্ট রকম আছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের জন্য একটি জাতীয় কমিটি করায় ‘খুব সহজে’ তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই কো-অর্ডিনেশনটার কারণে দেখবেন অনেক ঘটনার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটা তারা ঠিক করে ফেলছে।

সারা দেশে জনগণ নৌকার পক্ষে ‘যেভাবে সাড়া দিচ্ছে’ তাতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হবে বলে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এখন জনগণের কাছ থেকে যে সাড়া পাচ্ছি তাতে আমরা আশাবাদী যে, তারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবে, আমরা জয়ী হবো। যেহেতু আমরা জয়ী হবো, আমরা চাইবো যে, দেশে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা থাকুক, কোনো রকম যেন কোনো গোলমাল না হয়।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা কামাল হোসেনকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, আমাদের অনেক বড় বড় চাচারা চেষ্টা করছে। কিন্তু সেটা কোন আশায় কিসের আশায় আমি জানি না। আমরাই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছিলাম, আমরাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বলে বলে এতো কিছু করার পর এখন উনি একটা সময় তো চলেই গেলেন। এখন নৌকা থেকে নেমে গিয়ে একেবারে ধানের গোছা ধরেছেন। সেখানে গেছেন কোন আশায় আমি জানি না। কোন মরীচিকার পেছনে ছুটলেন আমি বলতে পারব না। তবে দুঃখ হয় যে, ওই এরা আজকে ওই যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধী তাদের সঙ্গে আজকে হাত মিলিয়েছে, যাদের আমরা বিচার করলাম।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, তারা আমাদের সরকার উৎখাত করবে, এখন আবার নির্বাচন, হেনতেন, এখন নাকি আবার সরকার গঠনও করে ফেলবে। তাহলে এদেশে তো আর মুক্তিযুদ্ধের কোনো চেতনা থাকবো না, উন্নয়নও থাকবে না। কারণ যারা পরাজিত শক্তি তারা চাইবে না যে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। আজকে বাংলাদেশ একটা সম্মানজনক অবস্থানে গেছে যেখানে পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরাও বলে যে, আমাদেরকে বাংলাদেশ বানিয়ে দাও। পাকিস্তানের প্রাইম মিনিস্টারও বলে যে, আমরা বাংলাদেশের মতো হতে চাই।

এই দেশের সন্তান হয়ে যারা পাকিস্তানের দালালি করেছে, তারা সব সময় বাংলাদেশ যেন উন্নত না হয় সে চেষ্টা করবে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে আগে অবহেলার চোখে দেখা হলেও বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের সম্মানটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কয়েকটা পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে। এই সম্মানটা ধরে রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে হাত দেয়ায় মাথা উঁচু হয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে অনেক ওপরে নিয়ে গেছে এবং এখন বাংলাদেশকে সমীহ করে। আমাদের মর্যাদা ধরে রাখতে হবে, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা বলেন, এদের বিচার করার পর মনে হলো, অভিশাপমুক্ত হয়ে গেল (জাতি)। এই আত্মবিশ্বাসেই ‘তরতর’ করে উন্নয়ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তের তথ্যও বের হবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ রকম একটা ঘটনা যে আমাদের জীবনে ঘটতে পারে, কেউ চিন্তাই করে নাই। এই ষড়যন্ত্রটা, এই চক্রান্তটা যে কত বিস্তৃত সেটার এখনো কোনো তদন্ত হয়নি। আমরা আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করেছি। কিন্তু খুনের সঙ্গে বিরাট একটা চক্রান্ত এবং এই চক্রান্তের পেছনে যে বিরাট একটা পরাজিত শক্তি আছে, সেটা এখনো কিন্তু অধরা রয়ে গেছে। হয়ত একদিন সময় আসবে, সেই সত্যও বেরিয়ে আসবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে ‘পুরো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটাই’ নস্যাৎ হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গত ১০ বছরে পুলিশ বাহিনীর উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকটি খাতের জন্যই কাজ করেছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশে পৌঁছানো, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি কমানো, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোসহ নানা উন্নয়নের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পুলিশের মহাপরিচালক (আইজিপি) ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ মোট ৮৮ জন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করতে সম্মত হন তাঁরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা ফুলের তোড়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সাবেক আইজিপি এ টি এম আহমেদুল হক চৌধুরী ও এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আব্দুর রহিম খান, বজলুল করিম, আব্দুল হান্নান ও মো. মতিউর রহমান বক্তৃতা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, এখন যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের সক্ষমতার ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের অগাধ আস্থা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকার ও দলের প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এটি চাকরিরত কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমের সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যেতে উৎসাহিত করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন এ দেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কষ্ট করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি ‘অকুণ্ঠ’ সমর্থন জানিয়ে অনুষ্ঠানে সাবেক আইপিজি শহীদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি যদি ক্ষমতায় না আসে তাহলে এতো উন্নয়ন ধ্বংস হয়ে যাবে।