মুক্তিযুদ্ধের সাড়া জাগানো সিনেমাগুলো

বিনোদন ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম
বাঙালির গর্বের দিন মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির জীবনে একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বছর। ত্রিশ লাখ শহীদ এবং হাজারো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলো। এদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে। মহান সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এ যাবত বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বিজয় দিবসে দেখতে পারেন সেগুলোর মধ্যে সাড়া জাগানো কয়েকটি চলচ্চিত্র।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমার তুলে ধরা হলো-

ওরা ১১ জন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা হচ্ছে ‘ওরা ১১ জন’। ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন প্রয়াত নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। এতে অভিনয় করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক, শাবানা, নূতন, হাসান ইমাম, এটিএম শামসুজ্জামান, খলিলউল্লাহ খান প্রমুখ। সিনেমাটিতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমায় ১১ জনের ১০ জনই বাস্তবের মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খসরু, মুরাদ, হেলাল ও নান্টু।

সংগ্রাম
এই সিনেমাটিও নির্মাণ করেছেন চাষী নজরুল ইসলাম। ‘সংগ্রাম’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। এর গল্প নেওয়া হয়েছে সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের ডায়েরি থেকে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন সুচন্দা, খসরু। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি সিনেমা এটি।

আবার তোরা মানুষ হ
বাংলাদেশের আরেক বিখ্যাত পরিচালক খান আতাউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’। সিনেমাটিতে যুদ্ধ পরবর্তী সামাজিক পরিবেশ ও বিশৃঙ্খলার চিত্র উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক ফারুক, অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ, চিত্রনায়িকা ববিতা, অভিনেত্রী রোজী আফসারী ও রওশন জামিল’সহ অনেকে।

মেঘের অনেক রং
এই সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে ১৯৭৬ সালে। হারুনর রশীদ পরিচালিত ‘মেঘের অনেক রং’ সিনেমায় যুদ্ধের সময় রুমা নামের একজন ডাক্তারের স্ত্রী ধর্ষণের পর সন্তানসহ কীভাবে কষ্টের শিকার হয় সে চিত্র উঠে এসেছে। রত্না কথাচিত্রের ব্যানারে সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন আনোয়ার আশরাফ ও শাজীদা শামীম। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাথিন, ওমর এলাহী, রওশন আরা, আদনান প্রমুখ। ‘মেঘের অনেক রং’ বাংলাদেশের দ্বিতীয় রঙিন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম রঙিন সিনেমা।

ধীরে বহে মেঘনা
এটি নির্মাতা আলমগীর কবিরের প্রথম কাহিনীচিত্র। মুক্তি প্রায় ১৯৭৩ সালে। ভারতীয় মেয়ে অনিতার প্রেমিক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়। সে ঢাকায় এসে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আরও গভীরভাবে মর্মাহত হয়। মানবিকতাবোধে আচ্ছন্ন হয় তার হৃদয়। অভিনয়ে ছিলেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, খলিল উল্লাহ খান প্রমুখ। অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন সুচন্দা। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশ ফ্লিমস্ ইন্টারন্যাশনাল।

একাত্তরের যীশু
সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাস অবলম্বনে ‘একাত্তরের যীশু’ নির্মিত। মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। অভিনয় করেছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন ফরীদি, জহির উদ্দিন পীয়াল, আবুল খায়ের, আনোয়ার ফারুক, কামাল বায়েজীদ ও শহীদুজ্জামান সেলিম।

শ্যামল ছায়া
হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ছবি এটি। মুক্তি পেয়েছিলো ২০০৩ সালে। এই ছবিতে মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে দেখা গিয়েছিলো প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদিকে। আরো ছিলেন নায়ক রিয়াজ, মেহের আফরোজ শাওন, স্বাধীন খসরু, শিমুল, চ্যালেঞ্জার, ফারুক আহমেদ, ডা. এজাজ ও তানিয়া আহমেদ।

জয়যাত্রা
অভিনেতা তৌকীর আহমেদ পরিচালিত প্রথম সিনেমা এটি। মুক্তি পায় ২০০৪ সালে। সদ্য প্রয়াত বিখ্যাত কাহিনীকার ও নির্মাতা আমজাদ হোসেনের গল্পে এটি নির্মিত। জয়যাত্রা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন একদল মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, মৃত্যু ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বিপাশা হায়াত, আজিজুল হাকিম, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ুন ফরীদি, তারিক আনাম খান, আবুল হায়াত, মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী।

গেরিলা
নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত আরেকটি সিনেমা ‘গেরিলা’। ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস থেকে নির্মিত। অভিনয় করেছেন জয়া আহসান, ফেরদৌস, এটিএম শামসুজ্জামান, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী ওয়াদুদ, শম্পা রেজা, গাজী রাকায়েত প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা হামলার চিত্র এতে উঠে এসেছে।

আগুনের পরশমণি
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘আগুনের পরশমণি’। নিজের লেখা উপন্যাস থেকেই সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বিপাশা হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত, ডলি জহুর প্রমুখ। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি বেশ কয়েকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

আমার বন্ধু রাশেদ
২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশি যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। মুহম্মদ জাফর ইকবাল’র শিশুতোষ উপন্যাস থেকে এটি পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম। অভিনয় করেছেন চৌধুরী জাওয়াতা আফনান। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইনামুল হক, হুমায়রা হিমু ও ওয়াহিদা মল্লিক জলি। এছাড়াও শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন রায়ান ইবতেশাম চৌধুরী, কাজী রায়হান রাব্বি, লিখন রাহি, ফাইয়াজ বিন জিয়া, রাফায়েত জিন্নাত কাওসার আবেদীন।

অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত পরিচালক সুভাষ দত্ত। এর তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা ববিতা, নায়ক উজ্জল ও আনোয়ার হোসেন। বিষয়বস্তুগত দিক থেকে এই ছবিটিকে সে সময় একেবারেই অন্যরকম বলে মন্তব্য করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা।

আলোর মিছিল
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। এটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক নারায়ণ ঘোষ মিতা। এই ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফারুক, ববিতা, রাজ্জাক ও সুজাতা।

হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড
সেলিনা হোসেনের রচিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’ অবলম্বনে ১৯৯৭ সালে একই নামে ছবি নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এই ছবিতে রয়েছে একজন সন্তানহারা মায়ের গল্প। যে চরিত্রটি করেছিলেন চিত্রনায়িকা সুচরিতা। এছাড়া ছবির বিভিন্ন চরিত্রে আরও আছেন সোহেল রানা, অরুনা বিশ্বাস, অন্তরা ও ইমরান।

মুক্তির গান
প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা প্রামাণ্য চিত্র এটি। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। এটি দক্ষিণ এশিয়া চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ উল্লেখ পুরস্কার এবং ২০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

এখনো অনেক রাত
১৯৯৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবিটি। এটি পরিচালনা করেন খান আতাউর রহমান। এটি তার পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের পরের সময়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিতে। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফারুক, সুচরিতা, আলীরাজ, ববিতা ও পরিচালকের ছেলে কণ্ঠশিল্পী আগুন।