ফুল হাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষের ঢল

সাভার সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
মহান বিজয় দিবসে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফুল হাতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লাখো মানুষের ঢল নেমেছে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বিজয় দিবসের শুরুতেই ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে একাত্তরে বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ছেলে-বুড়োসহ সব বয়সী মানুষ। ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর পর হাতে ফুল নিয়ে স্মৃতিসৌধে শহীদদের জন্য তৈরি বেদিতে শ্রদ্ধা জানান তারা। সকাল হতে না হতেই একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ফুলে ভরে ওঠে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদী।

বিজয় দিবসের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে স্মৃতিসৌধকে ঘিরে গোটা সাভার পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শীতকে উপেক্ষা করে গভীর রাত থেকেই মহাসড়কের পাশে ভিড় করতে থাকেন শিশু-ছেলে-বুড়োসহ সব বয়সী মানুষ। এসেছিলেন যুদ্ধাহত অনেক মুক্তিযোদ্ধাও। তাদের অনেকের হাতে দেখা যায় লাল-সবুজের পতাকা আর রঙবেরঙের ফুল। পোশাকেও লাল-সবুজের সরব উপস্থিতি। অনেকের হাতে শোভা পাচ্ছে ব্যানার। অনেকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে দেশের গান।

আজ রোববার (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুন সুর। এরপর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর একটি সম্মিলিত দল শহীদদের গার্ড অব অনার দেন। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে সকল শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। এ সময় দলের নেতাকর্মীরাও তার সঙ্গে ছিলেন। তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। পরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের জন্য জাতীয় স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এখন সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নেমেছে। শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিয়ে শহীদদের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করছে লাখো মানুষ। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদের স্মৃতির মিনার।

ঢাকা কলেজ থেকে এসছেন তবিবুর রহমান। তিনি বলেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। তাই বলে যেসব বীর আমাদের মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা ছিনিয়ে এনেছেন তাদের কি করে ভুলে যাই। আমি ক্যাম্পাসে থাকি। আজ বিজয় দিবস তাই শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছি এখানে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন ইয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, আজ বিজয়ের ৪৭ বছর। হৃদয়ের নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর শহীদদের প্রতি। তাদের কারণেই আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। শহীদদেরা মরে না, তারা লুকিয়ে আছেন ভাষায়, বাঙালির হৃদয়ে।

ধামরাই উপজেলার কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফেরদৌসি আক্তারের সঙ্গে স্মৃতিসৌধে এসেছেন তার মেয়ে রিফা তাসফিয়া ঐশী। তিনি বলেন, জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আজ আমরা দেশে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারি। তবে যে স্বাধীনতা তারা আমাদের দিতে চেয়েছিলেন তার অনেকটুকুই আমরা এখনো পাইনি।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য স্বাধীনতার কতটুকু রেখে যাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, এটা সত্যি যে স্বাধীনতার যে চিত্র আমরা আমাদের মধ্যে লালন করেছিলাম তার অনেকটুকুই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যেতে পারছি না। তবে আমি মনে করি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার অনেকটাই আমরা পেয়েছি। আবার অনেকটাই বাকি। তবে দেশের জনগণ চাইলে অধরা টুকু আমরা পেতে পারি। তরুণ প্রজন্ম বুকে স্বাধীনতাকে ধারণ করলে সত্যিকারের স্বাধীনতা আমরা অবশ্যই পাবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইয়াসিন রহমান বলেন, দুর্নীতিমুক্ত দেশ তখনই আমরা পাবো যখন সরকার নিজে হবে দুর্নীতিমুক্ত। তাই আমরা এমন একটি সরকার দেখতে চাই যারা নিজেদের জন্য না গুছিয়ে জনগণের জন্য একটি সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করবে।

আজ ১৬ ডিসেম্বর ৪৮তম মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্য-বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার চিরস্মরণীয় দিন। ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলো।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে যৌথ বাহিনীর কাছে। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যে দিবসটি সাড়ম্বরে উদযাপন করা হয়।

এবারের বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক শক্তির ধারক-বাহকদের প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত জাতি দিবসটি উদযাপন করবে।