পাকবাহিনী আমাকে কুৎসিত ভেবে ছেড়ে দিয়েছিলো: সুচন্দা

কোহিনূর আক্তার সুচন্দা: ফাইল ফটো

ডেস্ক রিপোর্ট, পিটিবিনিউজ.কম
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জননন্দিত অভিনেত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা কোহিনূর আক্তার সুচন্দা জানালেন, ভারতে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হলেও তাঁকে আটক করেনি তারা। পাকসৈন্যরা ভেবেছিল, আসলেই তাঁর চেহারা কুৎসিত। সুদর্শনা সুচন্দাকে সামনা-সামনি দেখেও সুন্দরীর পরিবর্তে তাঁকে কেনো কুৎসিত ভাবলো, পাঠকদের কৌতুহলের জবাব মিলবে জনপ্রিয় এ অভিনেত্রীর স্মৃতিচারণে।

ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির অভিনেত্রী ববিতা ও চম্পার বড় বোন কোহিনূর আক্তার সুচন্দার আরেকটি বড় পরিচয় হচ্ছে- তিনি খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের স্ত্রী। মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন জহির-সুচন্দা দম্পতি।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছিল?
সুচন্দা: প্রত্যাশাতা একটিই ছিল, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা স্বাধীন করা। স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। লাখো প্রাণের বিনিময় আর নানা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ভূখন্ড, নিজস্ব পতাকা আর বাঙালি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করেছি। স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলা পেয়েছি। এই প্রাপ্তি মানে প্রত্যাশার শতভাগ পূরণ হওয়া।

প্রশ্ন: অপ্রাপ্তি বোধ আছে?
সুচন্দা: না, অপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই; তবে দুঃখ আছে। দেশের জন্য লড়াই করে শহীদ হওয়া এবং জীবিত থাকা যেসব মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি, যেসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বজনেরা ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলাদেশে নানা দুঃখ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, তাঁদের জন্য খুবই কষ্ট হয়, দু:খ হয়। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। যেসব মুক্তিযোদ্ধা এখনো কষ্টে আছেন, তাঁদের কষ্টমোচনে যথাশিগগির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে- এই সরকারের কাছে এমনটিই আমার প্রত্যাশা।

কোহিনূর আক্তার সুচন্দা: ফাইল ফটো

প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত কোনো দুঃখবোধ আছে?
সুচন্দা: তাতো সবারই কম বেশি আছে। যুদ্ধের সময় আমার মায়ের পরিবারের ৯ সদস্য মানে পুরো একটি পরিবারকে পাকবাহিনী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। তাঁদের অপরাধ ছিল- তাঁরা বাঙালি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এতোটাই নিষ্ঠুরভাবে তাঁদের হত্যা করা হয় যে, পাক হানাদাররা প্রথমে প্রত্যেককে দিয়ে নিজের কবর খুঁড়িয়ে নেয়। এরপর তাঁদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে আমার স্বামী জহির রায়হান এবং ভাসুর প্রখ্যাত সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে হারিয়েছি। তারপরেও বলবো, বৃহত্তর অর্জনের পেছনে কিছু ত্যাগ তো থাকবেই। এই ভেবে খুশি যে, এতো ত্যাগের বিনিময়ে শেষপর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করতে পেরেছি আমরা।

প্রশ্ন: আপনার স্মৃতির কথা কিছু বলবেন?
সুচন্দা: সেই দিনের কথা মনে পড়লে ভয়ে এখনো শিউরে উঠি। জহির রায়হান অনেক আগেই কলকাতা গিয়ে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে শুরু করলেন। তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি সেখানে তিন মাস প্রদর্শন করে যে অর্থ পেলেন, তা মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দিলেন। পত্র-পত্রিকায় লিখে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত গড়ে তুললেন। আমি আমার ছোট্ট বাচ্চাদের নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে ১৫ দিনের মাথায় অনেক কষ্টে কলকাতায় গিয়ে পৌঁছলাম। একটি স্যাঁতস্যাঁতে বাড়িতে উঠলাম। মুক্তিযোদ্ধারা জহির রায়হানের কাছে আসতেন। তাদের জীর্ণশীর্ণ অবস্থা দেখে আমার খুব কষ্ট হতো। তাদের পরনের কাপড়-চোপড় ধুয়ে দিতাম। রেধে খাওয়াতাম। নিজেরা দিনের পর দিন উপোস করতাম। তারপরেও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষায় থাকতাম, স্বপ্নের সেই স্বাধীনতার।

প্রশ্ন: এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা মনকে আজও নাড়া দেয়?
সুচন্দা: হ্যাঁ, এমন অনেক স্মৃতিই আছে, একটির কথা বলি। অভিনয় করতে গিয়ে অনেক রকম মেকআপ নিতে হতো। অভিনেত্রী হিসেবে পাকিস্তানিরাও আমাকে চিনে। তাই তাদের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য মাথায় চিপচিপে তেল দিয়ে সিঁথি কেটে চুলকে চ্যাপ্টা করেছি। মুখসহ সারা শরীরে কালি মেখে বিশ্রী চেহারা বানিয়েছিলাম। কলকাতা যাওয়ার পথে যখন কুমিল্লা পৌঁছলাম তখন পাকসেনারা আমাকে ঘিরে ফেললো। যখন ঘোমটা সরালাম তখন আমার বদসুরুত বা কুৎসিত চেহারা দেখে তারা আর কাছে এলো না। আমি কথা না বলে ইশারায় তাদের বোঝালাম বাচ্চারা অসুস্থ। আমাকে যেতে দেয়া হোক। তারা আমার কুৎসিত রূপ দেখে আমাকে ছেড়ে দিল। কথাটা মনে পড়লে আজও ভাবি, অভিনয় করতে গিয়ে অনেক মেকআপ নিতে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবের এই মেকআপ ও অভিনয় আমার দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সবকিছুকেই হার মানিয়েছে।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার অনুভূতি কেমন ছিল?
সুচন্দা: সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এতো রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের কথা শুনে অব্যক্ত আনন্দে চোখের জল অঝোরে গড়িয়ে পড়েছিল। সেই আনন্দ শুধু হৃদয় দিয়েই অনুভব করা যায়; অন্য কোনোভাবে নয়।

প্রশ্ন: একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাবনার কথা?
সুচন্দা: এই গর্বের কোনো শেষ নেই। শুধু দেশে নয়, বিদেশে গেলেও সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাকে সম্মান জানায়। আমার কাছ থেকে স্বাধীনতার গল্প শুনতে চায়। ভালো লাগে যখন দেখি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কীভাবে এখন বিশ্ব দরবারে সমৃদ্ধির ইতিহাস নিয়ে দ্রুত মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। সত্যি, এই খুশি মুক্তিযুদ্ধে আমার সব হারানোর বেদনা দূর করে দেয়। মনে পড়ে যায় মান্না দের সেই গানের কথা-‘যা পেয়েছি সেই টুকুতেই খুশি আমার মন’। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।