বাংলাদেশ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে: পিটার ফারেনহোল্টজ

জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ

পিটিবিনিউজ.কম ডেস্ক
বাংলাদেশে নবনিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজের জন্ম ১৯৫৬ সালে হামবুর্গে। বাংলাদেশে যোগ দেওয়ার আগে জার্মান কনসাল জেনারেল ও ডেপুটি চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মুম্বাই, জাপান, ইথিওপিয়া ও টরন্টোতে। ২০১২-১৬-এ রাষ্ট্রদূত ছিলেন রুয়ান্ডায়। প্রশ্নকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

প্রশ্ন: আপনার দেয়ালে টানানো এই ছবিটি কার আঁকা?
পিটার ফারেনহোল্টজ: এটি হৃদয়স্পর্শী। এক রোহিঙ্গা শিশু এঁকেছে। অাঙ্গেলা ম্যার্কেলকেও ছবিতে রেখেছে, দেখুন। আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু দিবসে তারা আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। আমি চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের কাছে পাঠাব।

প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে চ্যান্সেলর অাঙ্গেলা ম্যার্কেলের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। দ্বিপক্ষীয় বিবেচনায় নয়, মানবতার বিবেচনায় ম্যার্কেল কক্সবাজারে এলে বিশ্বে একটা আলোড়ন উঠত, এটা সম্ভব?
পিটার ফারেনহোল্টজ: দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাঁদের মধ্যে উত্তম যোগাযোগ রয়েছে। ধনী দেশ হয়েও জার্মানি ১০ লাখ উদ্বাস্তুকে আশ্রয়দানের বোঝা অনুভব করে। তাই বাংলাদেশের বোঝাটা আমরা ভালো বুঝি। এই প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের এই সদিচ্ছার কথা আমি অবশ্যই আমার চ্যান্সেলরের কাছে পৌঁছে দেব। আগামী বছরে এর সম্ভাবনা আমরা দেখব। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক জার্মান রাজনীতিক কক্সবাজারে এসেছেন। সুতরাং কক্সবাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অাঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং জার্মান প্রেসিডেন্ট অবহিত রয়েছেন। আমরা আইসিসিতে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের পক্ষে।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো তো চলছেই
পিটার ফারেনহোল্টজ: ২০১৯ সাল থেকে জার্মানি নিরাপত্তা পরিষদে দুই বছরের জন্য সদস্য থাকবে। তখন আমরা কার্যকর ভূমিকা রাখার চেষ্টা করব।

প্রশ্ন: এই অঞ্চলকে কতটা জানেন?
পিটার ফারেনহোল্টজ: ভারতে দুই বছর (২০০৪-০৬) কাজ করেছি। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া সফর করেছি। বাংলাদেশে আসার আগে আমি যা শুনেছিলাম, তা আসার পরে বদলে গেছে। বাংলাদেশের বিরাট অগ্রগতি ও উন্নয়ন দেখে আমি বরং অভিভূত হয়েছি। গত আগস্টে আমি দায়িত্ব নিয়েছি। মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী। এর একটা ডায়নামিক মোমেন্টাম আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় জার্মান ব্যবসায়ীরা অংশীদার হতে চান। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক বাধা অভাবনীয়। আমি রুয়ান্ডায় রাষ্ট্রদূত ছিলাম।

জার্মানরা বাংলাদেশে প্রবেশে অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু অনুকূল অবস্থা না পেয়ে তঁারা এখন ভারতে যাচ্ছেন বলে অনুমান করি। ভালো ব্যবসায়ের বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ খুব নিচে, ১৭৬। অথচ রুয়ান্ডা এখন র‍্যাঙ্কিংয়ে ২৯তম অবস্থানে রয়েছে। মাত্র ছয় বছর আগেও তার এই র‍্যাঙ্কিং ছিল ১৩৭। রুয়ান্ডায় একটি নতুন ব্যবসায় নিবন্ধন অনলাইনেই করা যায়, আর গোটা প্রক্রিয়া শেষ হয় মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। বাংলাদেশে এটা দীর্ঘসূত্রতার বিষয়। তাই আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করতে হবে। তাকে আরও বেশি দক্ষ হতে হবে। এ জন্য একটি ওয়ান স্টপ উইন্ডো দরকার। আমি বিশ্বাস করি, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসতে পারে। ভারতের মতোই ব্যাপক সুযোগ আছে। নির্বাচনের পর আমরা একটি নতুন সরকার পাব, তাদের সঙ্গে কথা বলব।

প্রশ্ন: রুয়ান্ডা গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে এতটা ওপরে উঠল?
পিটার ফারেনহোল্টজ: জনগণ বুঝতে পেরেছে যে সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা রয়েছে, তা আগের মতো থাকতে পারে না। তাই তারা একটি জাতীয় সংলাপে বসে একটা আপসরফায় পৌঁছেছে। তারা একটি রিকনসিলিয়েশনের মধ্যে যাওয়ার জন্য নিজেরাই পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, মেলবন্ধন তখনই সম্ভব যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। যথেষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা দেশটি বুঝেছে মেধাবী ও যোগ্য মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করাই হবে তাদের মূলধন। এখন আফ্রিকার সব থেকে নিরাপদ দেশ রুয়ান্ডা। রাজনীতিবিদেরা একত্র হয়েছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ শ্রমক্ষেত্রে ও ঢাকায় বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সরবরাহে আপনাদের কী ভূমিকা?
পিটার ফারেনহোল্টজ: জার্মান অর্থনীতির সাফল্যের মূল কারণ হচ্ছে সামাজিক সংস্কার। এর আওতায় দুর্ঘটনা বিমা, মেডিকেল বিমা ইত্যাদি চালু করায় জার্মান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু অনেক গার্মেন্টস কোম্পানিকে বিমা চালু করতে আমরা যে পরামর্শ দিয়েছি, তা তারা মানতে অনাগ্রহী। জার্মানরা এ বিষয়ে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। সরকার সম্ভব সব রকমের সহযোগিতা দিচ্ছে। কিন্তু মালিকদের বুঝতে হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেকেরই সামাজিক দায়িত্ব থাকা উচিত। ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি দিতে জার্মানরা প্রস্তাব করেছে মেঘনার পানি খাওয়ার উপযোগী করে ঢাকায় নিয়ে আসতে। মেঘনার পানি যারা এত দূষিত করছে, মুনাফাভোগী তেমন কারখানাগুলোকে দায়িত্বের হিস্যা নিতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে পরিবর্তন ছাড়াই সেটি পাস হলো।
পিটার ফারেনহোল্টজ: এ বিষয়ে আমি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। সরকার আশ্বস্ত করেছে যে এই আইনের অপব্যবহার ঘটবে না। আমরা এ কথায় আস্থা রাখতে চাই। আমরা জার্মানরা বাক্‌স্বাধীনতায় সর্বদা সোচ্চার। আমরা মনে করি, বাক্‌স্বাধীনতার অনুশীলনে কোনো দ্বন্দ্ব দেখা দিলে আমরা বাক্‌স্বাধীনতারই পক্ষাবলম্বন করি। কারণ, বাক্‌স্বাধীনতাকে যদি অবদমিত করা হয়, তাহলে সেটা গোপনীয় তৎপরতার প্রবণতাকেই তীব্রতা দেয়।

প্রশ্ন: আপনার কথায় অবস্থান বদলের ইঙ্গিত পাই। কালো আইন থাকুক, প্রয়োগ না করলেই হলো? প্রধানমন্ত্রী অবশ্য একটা আশ্বাস দিয়েছেন যে ভোটে পুনরায় এলে…
পিটার ফারেনহোল্টজ: আমি আপনার দেশে একজন বিদেশি অতিথি। কী উপায়ে পার্লামেন্ট আইন পাস করবে, সে বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারি না। এটা বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। আমরা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় বিশ্বাস করি। সেই ভিত্তিতে আমরা শুধু পরামর্শ দিতে পারি। আপনারা অবশ্যই ভুলবেন না যে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং জার্মানির অভিজ্ঞতা রয়েছে যে আমরা অন্যের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। বাংলাদেশে জার্মান রাষ্ট্রদূত হিসেবে আশা করব, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট ডিজিটাল আইনে পরিবর্তন আনবে। বিষয়টি আমার জন্য বলা একটু স্পর্শকাতর, কারণ তাদের কী করা উচিত সে বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী যেটা বলেছেন, আমরা সেটা অবগত রয়েছি এবং আমাদেরও সেই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, উন্নয়নের জন্য এটা সব সময় মনে রাখতে হবে যে জনগণকে তার মতামত অবাধে প্রকাশ করতে দিতে হবে। বাক্‌স্বাধীনতারও নিজস্ব রুলস থাকতে হবে।

প্রশ্ন: জাতীয় সংলাপ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ?
পিটার ফারেনহোল্টজ: সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সংলাপ হয়েছে, আমি তাকে স্বাগত জানাই। আসলে গণতন্ত্রের মূল কথা এটাই, আলোচনায় বসতে হবে। এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আশা করি, সব দলই নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।
ডিসেম্বরে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে অনিশ্চয়তা থাকবে না। বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নিয়ে আমরা ইউরোপীয়রা পশ্চিমা সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে থাকি। কারণ, আমরা অবশ্যই বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে পারি। আমরা সবাই চাই একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। কেউ যদি আমাদের কাছে সাহায্য বা পরামর্শ চায়, তাহলে আমরা তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি। গণতন্ত্র এমন বিষয় নয়, যা কেবল সরকারই ম্যানেজ করতে পারে। এটা একটি প্রক্রিয়া, যাতে সব পক্ষ অংশ নেবে। প্রত্যেক রাজনীতিকের ভূমিকা থাকবে। তাহলেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। এতে অংশগ্রহণকারী সবাইকে একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। গণতন্ত্র মানে সর্বদাই সমঝোতা। কোনো একটি পক্ষ দাবি করতে পারে না যে তার পথই শতভাগ সঠিক। যদি কেউ দাবি করে থাকে যে আমি এই প্রক্রিয়ার অংশ নই, আমি এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেব না, তাহলে সে নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করতে পারে না।

প্রশ্ন: এর আগে আপনি কি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেছেন? কী অভিজ্ঞতা?
পিটার ফারেনহোল্টজ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসি তার নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা ও আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে ব্রিফ করেছে। আমাদের প্রত্যাশা কী, সেটা আমরা তাদের কাছে ব্যক্ত করেছি। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছি যে নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক। আমি এবং ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিস্থিতিকে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়টি তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আর নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, সেই বিষয়ে আমরা আমাদের মনোভাব তাঁর কাছে তুলে ধরেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সব পরিস্থিতি একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুকূলে রাখতে তিনি সম্ভব সব পদক্ষেপ নেবেন।

আমরা আসন্ন সংসদকে এমনভাবে দেখতে চাই, যাতে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতিফলন ঘটে।

প্রশ্ন: ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আপনাদের আলোচনা?
পিটার ফারেনহোল্টজ: কয়েক দিন আগে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। কামাল হোসেন আমাদের অবহিত করেছেন, সরকারের সঙ্গে তাঁরা যে আলোচনা করছেন, সেটা ধারাবাহিক এবং চলমান থাকবে। আমরা বিরোধী দলের কাছেও আমাদের প্রত্যাশা কী, সেটা ব্যক্ত করেছি।

প্রশ্ন: ধরপাকড় বা গায়েবি মামলার অভিযোগ শুনেছেন? এর সত্যতা যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ? এ বিষয়ে আপনাদের কোনো উদ্বেগ?
পিটার ফারেনহোল্টজ: আমি বিশ্বাস করি, আইনের শাসন যেকোনো দেশের অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সর্বত্র নাগরিকেরা দেখতে চাইবেন যে রাষ্ট্র তাঁদের মানবাধিকার সংরক্ষণ করেছে। কেউ বলে থাকেন, মানবাধিকারের যে হাতিয়ারগুলো রয়েছে, সেগুলো অন্য দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমি তখন তাদের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকারের সনদ দেখতে বলি। যখন বিশ্বের কোথাও কোনো ধরনের মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটে, তখন সিভিল সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক এনজিও এবং দূতাবাসগুলোর উচিত সরকারের সঙ্গে বসা। আমরা কীভাবে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারি, যাতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য মানবাধিকারের লঙ্ঘন এড়ানো যায়। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের বিষয়ে বর্ণিত রয়েছে। এসব বিষয়ে পুলিশের প্রশিক্ষণ দরকার আছে। তাদের বোঝা দরকার, এটা তো তাদের ওপরে চাপানো কোনো বিষয় নয়। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি, বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটুক, তা রোধে আমাদের একটা সক্রিয় উদ্যোগ থাকবে।

প্রশ্ন: সব দল শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে টিকে থাকবে?
পিটার ফারেনহোল্টজ: আপনি যদি জার্মানির ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রে পৌঁছাতে জার্মানদের বহু বছর লেগেছে। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে পরিপক্বতা অর্জন করার আগ পর্যন্ত কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মুখ দেখিনি। যদি আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় সব রাজনৈতিক দল এবং মতের সমাবেশ ঘটে, তাহলে সেটা হবে একটা বিরাট অগ্রগতি। কিন্তু তাকে সফল করতে হলে সবাইকে এই প্রক্রিয়ার অংশে পরিণত হতে হবে।

প্রশ্ন: নাৎসি দল নিষিদ্ধ, কিন্তু তাদের সমর্থকদের বাক্‌স্বাধীনতার চর্চা?
পিটার ফারেনহোল্টজ: তারা সংখ্যায় নগণ্য। তারা সংবিধান মেনে চলে। আর অনুমতি দিলেও দল চালানোর মতো লোকজন নেই। কোনো ছোট শহরেও তাদের কেউ নির্বাচিত হয়নি। রক্ষণশীল, উগ্র রক্ষণশীলেরা অবশ্য সক্রিয় আছে।

প্রশ্ন: আসন্ন নির্বাচন জার্মানরা পর্যবেক্ষণ করবে? ইইউ কেন পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না?
পিটার ফারেনহোল্টজ: পর্যবেক্ষণ নয়, নজরদারি বলুন। ইইউর দলটি নভেম্বরের শেষে পৌঁছাবে। সংখ্যায় কম, তারা হবে একটি টেকনিক্যাল মিশন। আমি কিন্তু ভোটের দিন মাঠে থাকব। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় ভোটকেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেছি।

প্রশ্ন: পর্যবেক্ষক দল আর মনিটরিং দলের মধ্যে তফাত কী? এই সিদ্ধান্তের কারণ?
পিটার ফারেনহোল্টজ: বিরাট তফাত। মনিটরিং মিশনের সদস্য হবেন হাতে গোনা কয়েকজন। তাঁরা নির্বাচনের আগে বা পরে কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেবেন না। রিপোর্ট দেবেন বাংলাদেশ সরকার, ইইউ এবং তার সদস্যদের। বিশ্বের দেড় শটি দেশে তো শতাধিক লোকের সমন্বয়ে পর্যবেক্ষক দল পাঠানো সম্ভব নয়। এর সঙ্গে বাজেটের প্রশ্ন জড়িত।

প্রশ্ন: অন্যান্য দূতাবাস বা সংস্থা, তারাও রিপোর্ট দেবে না?
পিটার ফারেনহোল্টজ: তারা দিতে পারে। মার্কিন মনিটরিং টিম থাকবে।

প্রশ্ন: আপনি আগস্টে এসেছেন। তিন মাসে কী ধারণা পেলেন?
পিটার ফারেনহোল্টজ: আপনাদের নিবন্ধিত দল, ভোটার তালিকা আছে, ভোটে জয়-পরাজয় ঠিক হবে, এভাবেই গণতন্ত্র চলে। সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। খেলার রুলস পছন্দ না হওয়ার কারণে না খেলার মনোভাব গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আমি এটা দেখে বিস্মিত যে বাংলাদেশের রাজনীতি বড়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমি আশা করব, বিরোধী দল ভিন্নতর কী উপায়ে দেশ চালাবে, তার রূপকল্প পরিষ্কার করে বলবে। জার্মানিতে দলগুলো পরের চার বছরে কী করবে, সেটা আগাম ঘোষণা করে থাকে। এতে কোনো অস্পষ্টতা থাকে না। অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট থাকে। স্বাস্থ্য বা প্রতিরক্ষায় কে কী করবে, তা মানুষ আগেই খুব নির্দিষ্টভাবে বুঝতে পারে। পাঁচ থেকে দশটি বিষয় এভাবে তারা লিখিত রূপে ভোটের আগেই প্রকাশ করে। এরই একটা ঘাটতি দেখি। বরং ভোটের প্রক্রিয়াতেই বিরোধী দলের মনোযোগ বেশি। মেধাবী তরুণেরা সহজেই পলিসি পেপার লিখতে পারেন।

প্রশ্ন: জার্মান থিংকট্যাংক বার্টলস এর আগে বাংলাদেশকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় রেখেছে। বলেছে, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক শর্ত এখানে অনুপস্থিত।
পিটার ফারেনহোল্টজ: ওটি বড় থিংকট্যাংক সত্যি। আমি আসলে বাংলাদেশে পা রেখে ইতিবাচকভাবে বিস্মিত হয়েছি। বাংলাদেশে যা চলছে, তা স্বৈরতন্ত্র নয়। স্বৈরতান্ত্রিক দেশে কাজ করা, আমার দেশের অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি রাজপথে বিক্ষোভ হতে এবং সংবাদমাধ্যমে সরকারের প্রচুর সমালোচনা দেখেছি। আপনারা কি বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শোনেন? কী বলেন তারা?

প্রশ্ন: হ্যঁা। অনেকে বলছেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন।
পিটার ফারেনহোল্টজ: এটা ডিকটেটরশিপ নয়, কেউ কর্তৃত্ববাদী বলতে পারেন, আসলে অবস্থাটা গণতন্ত্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি, বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কান্ট্রি ইন ট্রানজিশন। সম্পূর্ণরূপে কার্যকর থাকা অর্থনীতি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান। গণতন্ত্র রাতারাতি আসবে না, এ জন্য সময় দরকার। সিঁড়ির পর সিঁড়ি ভেঙে এগোতে হবে। সে কারণেই আসন্ন নির্বাচন এতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে সত্যিকারের বিরোধী দল সংসদে বসলে সেটা হবে একধাপ অগ্রগতি। দ্বাদশ নির্বাচনে দেখবেন আরও কতিপয় ঘটনা সামনে এসেছে। এখনই খুব বেশি কিছু আশা করা সমীচীন নয়। পাশ্চাত্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে যা ধারণা, সেটা বাস্তবতার চেয়ে খারাপ হতে পারে। সে কারণেই আমি যে ধারণা নিয়ে এসেছিলাম, সেটা বাস্তবে ভিন্ন দেখে আমি অবাক হয়েছি। বাংলাদেশের সামনে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষমাণ বিবেচনায় আমি আশাবাদী।

প্রশ্ন: জার্মান শাসনকাঠামোর ভালো দিক কী?
পিটার ফারেনহোল্টজ: দ্বৈত কক্ষের সংসদ এবং সংখ্যানুপাতিক ভোটে সংসদের গঠন ‘উইনার্স টেক অল’কে রুখে দিয়েছে। কোয়ালিশন রাজনীতির বিকাশ ঘটিয়েছে। আর কোয়ালিশন রাজনীতিই রাজনীতিকদের সমঝোতা শিখিয়ে থাকে। মার্কিন ও ব্রিটিশ পদ্ধতি রাজনীতিকদের উইনার্স টেক অল-এর রাজনীতি রপ্ত করিয়ে থাকে। সেখানে সমঝোতার জায়গা অত্যন্ত সংকীর্ণ।
সৌজন্যে প্রথম আলো।