নির্বাচনে যে পক্ষই জয়ী হোক, লাভ বিএনপির: আশীষ কুমার দে

পিটিবিনিউজ.কম
আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনটি রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্ধিতা করছে- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট, বর্ষিয়ান আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোট। এর মধ্যে নীতি-আদর্শের দিক থেকে বামপন্থীরা আপোসহীন থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে আছে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ভোটের মূল লড়াই এ দুই জোটের মধ্যেই হবে। কোন পক্ষ জিতবে, তা নির্ধারণ করবে সাধারণ ভোটাররা এবং নিশ্চিত হওয়া যাবে ৩০ ডিসেম্বর ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার পর।

তবে যে পক্ষই জিতুক, এবারের নির্বাচনে বেশি লাভবান হবে বিএনপি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ পন্থায় গড়ে ওঠা দলটি জন্মলগ্ন থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে গাঁটছাড়া বেঁধে আছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল শাহ আজিজুর রহমানকে; যিনি মুক্তিযুদ্ধে চরম বিরোধীতা করেছিলেন। এছাড়া জিয়ার সময়কার সংসদ ও মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য কয়েকজন স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। তবে সব ছাপিয়ে খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপি কার্যত একটি সাম্প্রদায়িক দলে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি জামাতে ইসলামীকে জোটসঙ্গী করে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর চিহ্নিত দুই যুদ্ধাপরাধীকে (আদালতের রায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া) মন্ত্রিসভার সদস্য করা এবং দীর্ঘ দেড়যুগ জামাতকে জোটসঙ্গী করে রাখার মধ্য দিয়ে অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি জামাত-নির্ভর ও যুদ্ধাপরাধী আশ্রিত দলে রূপ নিয়েছিল।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সেই কলঙ্ক মোচন হতে যাচ্ছে। দলটি এবার নির্বাচন করতে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। এই ফ্রন্টের মূল উদ্যোক্তা ও শীর্ষ নেতা গণ ফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তাঁর সঙ্গে আছেন জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রব, বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, ডাকসুর সাবেক দুই ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’র প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লা চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ ও সাবেক সচিব এস এম আকরামের মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিরা।সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন আওয়ামীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী গ্রেনেড হামলায় নিহত শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া ছাড়াও ১০ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর প্রার্থীরা এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করবেন।

জামাতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকলেও দলটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারিয়েছে।ফলে দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন করতে পারছে না জামাত। হয়তো জামাতের স্বল্পসংখ্যক নেতা বিএনপি পরিচয়ে ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে প্রার্থী হতে পারেন। তাই বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টে জামাত কার্যত থাকলেও দৃশ্যত নেই।

অন্যদিকে নির্বাচনী জনসভাগুলোতে ড. কামাল, আ স ম রব ও কাদের সিদ্দিকীসহ ঐক্যফ্রন্ট নেতারা তাঁদের বক্তব্যে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করবেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের কথা বলবেন, জয় বাংলা স্লোগান উচ্চারণ করবেন। একই মঞ্চে ঐক্যফ্রন্টের শরিক হিসেবে বিএনপির শীর্ষ নেতারাও থাকবেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর কথা ও জয় বাংলা স্লোগান উচ্চারণ না করলেও এর বিরোধীতা করতে পারবেন না। আবার ড. কামাল, এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মোহাম্দ মনসুরদের সঙ্গে দেশজুড়ে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ করায় বিএনপিকে জামাত বা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি-নির্ভর ও যুদ্ধাপরাধী আশ্রিত দল বলেও ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ বিএনপির সারা অঙ্গে মেখে থাকা আবর্জনা অনেকটাই এবার ধুয়ে-মুছে যাবে। তাই আসন্ন নির্বাচনে মহাজোট কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট- যে পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পাক না কেনো, ভবিষ্যত রাজনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি-ই বেশি লাভবান হবে।
বি. দ্র. লেখাটি গত ২২ নভেম্বর লেখকের ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত হয়।  
আশীষ কুমার দে: প্রধান সম্পাদক, পিটিবিনিউজ.কম