মাশরাফির ক্যারিয়ারের স্মরণীয় দিন আজ

ফাইল ছবি।

ক্রীড়া প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম বোলিং স্তম্ভ ও একদিনের আন্তর্জাতিকে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি চাইলেই কি এই দিনটিকে ভুলে যেতে পারবেন! কি করে ভুলবেন? বিশ্ব ক্রিকেটে তার যে এতো নাম, মানুষের এতো ভালোবাসা সবই তো এই দিনটি দিয়ে শুরু। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশ দলের জীবন্ত এই কিংবদন্তির।

মাশরাফির ক্যারিয়ারের শুরুটাই হয়েছিলো চমক জাগিয়ে। একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ না খেলেও টেস্ট অভিষেক হয়ে যায় মাশরাফির। সৌভাগ্যের রাজটীকা কপালে নিয়েই যেন তার জন্ম।

ওই সময়ের জিম্বাবুয়ে ছিলো ভীষণ শক্তিশালি, যারা বাংলাদেশকে বলে কয়ে হারিয়ে দিতো। মাশরাফির ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচটিতে বৃষ্টির কল্যাণে ড্র পেয়ে যায় টাইগাররা। এক ইনিংস বল করার সুযোগ পেয়ে নড়াইল এক্সপ্রেস নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। যার হাতের রেখায় মিশে আছে সৌভাগ্য। সেই মাশরাফির জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য চোট। তাকে একটা সময় মনে করা হতো বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার। ২০০০ সালে দিকেই ঘন্টায় ১৩৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করতে পারতেন। চোটাঘাত আর অস্ত্রোপচার গতিটা কমিয়ে দিয়েছে আস্তে আস্তে।

টেস্টের নেতৃত্বও পেয়েছিলেন। ২০০৯ সালে ওই টেস্টেই চোট নিয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে যেতে হয় মাশরাফিকে। তারপর আর টেস্ট খেলার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারেননি।

টি-টোয়েন্টিকে বিদায় বলেছেন গত বছরের এপ্রিলে। তবে এখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের সফলতম অধিনায়ক এই মাশরাফিই। তার কাঁধে চড়ে একদম বদলে গেছে দেশের ওয়ানডে ক্রিকেট। সামনে বিশ্বকাপ, মাশরাফির হাত ধরেই আরেকটি বড় স্বপ্নপূরণের আশায় দিন গুণছেন কোটি টাইগার ভক্ত।

মাশরাফির সংক্ষিপ্ত জীবনী
মাশরাফি বিন মর্তুজার ডাক নাম কৌশিক। তিনি ১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর নড়াইলে তার নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

নানাবাড়িতেই বড় হয়েছেন মাশরাফি। কারণ তার নানীর ধারণা-বিশ্বাস ছিলো মাশরাফির মা সে সময় বাচ্চা-লালন পালনের উপযুক্ত না। আসলে বাবা-মার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় সে সময় মাশরাফির মার যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেজন্য মাশরাফিকে নিজের কাছেই রেখেছিলেন তার নানী। মাশরাফির বাবার বাসা আর নানার বাসার দূরত্ব পাঁচ মিনিটেরও ছিলো না। তাই শিশু মাশরাফির নানির কাছে থাকতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি।

মাশরাফির যখন ছয় মাস বয়স তখন তার পিতাকে চাকরি উপলক্ষে নড়াইল ছেড়ে সস্ত্রীক ঢাকায় এসে বসবাস করতে হয়। তিনি ছিলেন বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির কর্মাধ্যক্ষ। মাশরাফি থেকে যান নানির কাছে। ছেলেকে দেখতে মা পনেরো দিন পর পর নড়াইল আসতেন। এভাবে দুই বছর টানাপোড়েনের পর মাশরাফির বাবা চাকরি ছেড়ে নড়াইল এসে স্থায়ী হোন।

মাশরাফির বাবার নাম গোলাম মর্তুজা, তিনি বর্তমানে ব্যবসায়ী। আর মায়ের নাম হামিদা মর্তুজা, তিনি গৃহিনী। মাশরাফির ডাক নাম কৌশিক। এ নামেই পরিবারে পরিচিত তিনি।

ছোটবেলা থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন মাশরাফি। তাদের বাড়ির পাশেই ছিলো স্কুল মাঠ। বড়রা সে মাঠে ক্রিকেট খেলতেন। স্কুলের মাঠে বড়দের ক্রিকেট খেলা দেখে দেখে মাশরাফির ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। উইকেট কিপারের পাশে মাশরাফি দাঁড়িয়ে থাকতো। কিন্তু আহত হবে ভেবে বড়রা তাকে সরিয়ে দিতো।

উইকেট কিপারের পাশে দাঁড়িয়ে যেতে চায়। বড়রা সেখান থেকে তাকে সরিয়ে দিলে তার মন খারাপ হয়। কিন্তু যার ক্রিকেট নিয়ে এত আগ্রহ তাকে তো কেউ আটকে রাখতে পারেনা। মাশরাফিকেও পারেনি।

নব্বইয়ের দশকে নড়াইলের ক্রিকেটার-সংগঠক শরীফ মোহাম্মদ হোসেন উঠতি তরুণদের যত্ন নিতেন। তিনি মাত্র ১১ বছর বয়সের মাশরাফিকে তার ক্লাব নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন। এ সময় থেকেই মাশরাফির গতি দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে শুরু করে। ১৯৯১-এর দিকে মাগুরায় বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের বিকেএসপি কোচ বাপ্পির সান্নিধ্যে এসে বোলিংয়ের অনেক মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। পরের বছর জাতীয় কোচ ওসমান খান নড়াইলে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালাচ্ছিলেন। ওই সময় মাশরাফির আমন্ত্রণ আসে খুলনায় খেলার জন্য। খুলনায় তার গতি ও সুইং হইচই ফেলে দেয়। সেই সূত্রে খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ এবং ঢাকায় আসা।

পরবর্তীতে সুযোগ পান জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। সেসময় তার বোলিং কোচ অ্যান্ডি রবার্টসের পরিচর্যায় পাল্টে যান মাশরাফি। অনুর্ধ ১৯ দলে থাকতে মাশরাফি দারুন পারফরম্যান্সের কারণে জিম্বাবুয়ে দলের বিরুদ্ধে ‘এ’ দলের খেলায় তিনি সুযোগ পান। এ নিয়ে সমালোচনা হয়। কারণ মাশরাফি ঢাকার কোনো সিনিয়র ডিভিশন লীগেও খেলেননি। তবে সমালোচকদের মোক্ষম জবার বলিংয়ের মাধ্যমে দিয়েছিলেন মাশরাফি। সেই সিরিজে মাশরাফি এক ম্যাচে চার উইকেট নিয়েছিলেন। এরপর নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে তার নাম হয়ে যায় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। এরপর আর ইনজুরি ছাড়া আর কেউ মাশরাফি বিন মর্তুজাকে আটকাতে পারেনি।

মাশরাফির ছয়-সাত বছর বয়সের সময় তার নানার বন্ধু শৌখিন হস্তরেখাবিদ নেপাল সরকার মাশরাফির হাত দেখে বলেছিলেন, এই ছেলে বড় হয় উচ্ছন্নে যাবে অথবা কালজয়ী কোনো ভূমিকা রাখবে। আর মাশরাফি হয়েছেন বাংলাদেশের গর্বই।

পড়ালেখায়ও ভালো ছিলেন মাশরাফি। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করেন নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ২০০৩ সালে। এরপর দর্শন শাস্ত্রে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ক্রিকেটের ব্যস্ততার কারণে তার একাডেমিক পড়াশুনা শেষ করা হয়নি।

দেশের কৃতি এই ক্রিকেটারকে সবাই বাইক প্রিয় এবং হাসিখুশি ও উদারচেতা মানুষ হিসেবেই জানে। নিজের শহরে তিনি প্রচণ্ড রকমের জনপ্রিয়। এখানে তাকে ‘প্রিন্স অব হার্টস’ বলা হয়।

ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় সুমনা হক সুমির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০০৬ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মাশরাফি ও সুমি দম্পত্তি বর্তমানে দুই সন্তানের জনক। সন্তান- মেয়ে: হুমায়রা মর্তুজা, ছেলে: সাহেল মর্তুজা।