প্রসঙ্গ একাদশ সংসদ নির্বাচন: আশীষ কুমার দে

আশীষ কুমার দে

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা কিছুক্ষণ আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া টেলিভিশন ও বেতার ভাষণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন। এরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা, বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বয়কট করবে কিনা ইত্যাদি নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা। এ ধরনের জল্পনা-কল্পনা খুবই স্বাভাবিক। যে বিএনপি এখন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে, একই সংশয়ের কারণে দশম সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল, সেই বিএনপির শাসনামলেই তো কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। আর স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলের কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে। তবে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নজির খুব কম আছে। প্রকৃত অর্থে, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পঞ্চম সংসদ, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম সংসদ এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। যদিও ওই তিনটি নির্বাচনেও পরাজিত পক্ষ বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। এছাড়া অন্য কোনো জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ প্রায় সকল বিরোধী দল বর্জন করেছিল। তাই ওই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি- এ কথা বলার অধিকার তাদের নেই।

৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়ে শত শহীদের রক্ত¯œাত রাজপথ বেয়ে মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ১৯৯১ সালে বিশ্ববাসী প্রশংসিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় মসনদে আসীন হলেও গণতন্ত্রের প্রতি ন্যুনতম সম্মান দেখায়নি দলটি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্বঘোষিত বিজয়ী দল হিসেবে সরকার গঠন করে বিএনপি। কিন্তু গণআন্দোলনের মুখে দেড় মাসের ব্যবধানে ৩০ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় দলটি। জনরোষের হাত থেকে রক্ষা পেতে পদত্যাগের আগে একদলীয় সংসদে পাস করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল। একই বছরের ১২ জুনের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হয় বিএনপি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে ফের বিজয়ী হয় দলটি। যদিও ওই নির্বাচন যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এম এ সাঈদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন কার্যত দলীয় সরকারের মতোই বিতর্কিত দায়িত্ব পালন করেছিল। এরপর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বিএনপি-জামাত জোট সরকার রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে বেআইনিভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তাঁকে এবং আজ্ঞাবাহী সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজকে দিয়ে কি নোংরা খেলায় মেতেছিল তা দেশবাসী এখনও ভোলেনি; যার অবসান ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই বিএনপি-ই এখন নির্দলীয় সরকারের জন্য আন্দোলন করছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট গঠন করে দু’দফা সরকারের সঙ্গে সংলাপ করেও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করতে পারেনি বিএনপি। এরই মধ্যে ঘোষিত হয়েছে নির্বাচনী তফসিল। এখন বিএনপি বা জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের সামনে একটিই পথ খোলা আছে; তা হচ্ছে জনগণের ওপর আস্থা রাখা। কারণ জনগণের শক্তিই তো বড় শক্তি।

নিকট অতীতে আমরা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রভাবশালী মেয়র প্রার্থী শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নির্দলীয় মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিশাল জয় দেখেছি। সরকারদলীয় বাঘা বাঘা নেতারা শামীম ওসমানের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছিলেন। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি-না, তা নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনও সন্দিহান ছিল। যে কারণে কমিশনের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেরিতে চাওয়ায় সেনা মোতায়েন সম্ভব হয়নি। সেনা মোতায়েন হচ্ছে না- এটা জেনে আইভী বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি ভোটারই আমার সেনাবাহিনী। হ্যাঁ, জনগণের ওপর সে আস্থা আইভীর ছিল এবং তাঁর প্রতিদানও জনগণ দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো- দেশবাসীর প্রতি কী বিএনপির সে আস্থা আছে? অন্যদিকে বিএনপির প্রতি জনগণের আস্থা আছে? গণআস্থা অর্জনের মতো কোনো কাজ কী বিএনপি করেছে? এর জবাব পেতে হলে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের, অন্তত ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন কতোটা বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, তা-ও দেখতে হবে আমাদের।
আশীষ কুমার দে: প্রধান সম্পাদক, পিটিবিনিউজ.কম