রাজধানীতে আজও গণপরিবহন নেই, ভোগান্তি পথে পথে

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবিতে সারাদেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা টানা ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট চলছে। এতে গতকাল থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। আজও সকালে রাজধানীর অফিসগামী হাজারো মানুষ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোনো ধরনের যানবাহন না মেলায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

রাজধানী ঢাকার গাবতলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, শাহবাগ, গুলিস্তানসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় আজ গণপরিবহনের জন্য মানুষদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে বিআরটিসির বাস গতকালের চেয়ে আজকে বেশি দেখা গেছে। গণপরিবহন না থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলেছে। এককভাবেও অটোরিকশা চলেছে। কেউ কেউ রিকশা অথবা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে তিন-চারগুণ বেশি ভাড়ায় গন্তব্যে যাচ্ছেন। আজ সোমবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড ও নতুন বাজার এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

তবে হঠাৎ পরিবহন শ্রমিকদের এই ধর্মঘট মানুষের মনে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। এটা স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে জানান অনেকে।

কারওয়ান বাজার গণপরিবহনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা এক বেসরকারি চাকরিজীবী খোরশেদ আলম। তিনি যাবেন মিরপুরে। গতকাল তিনি মিরপুর-১ রিকশাতে গিয়েছিলেন ৩০০ টাকা দিয়ে। আজ রিকশাও তেমন পাচ্ছে না। তিনি বলেন, অফিসে লেট করে গেলেও বেতন কাটা যাবে। রিকশা দিয়ে গেলেও বেশি টাকা লাগছে। আমরা আসলে জিম্মি। এই ধর্মঘটের কোনো মানে নেই। তারা (পরিবহন শ্রমিকরা) কি চায় তারা মানুষ মারবে কিন্তু শাস্তি দেয়া যাবে না। এটা কি মগেরমুল্লুক।

রবিউল ইসলাম নামে আরেকজন বলেন, সরকারের এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এটা অযৌক্তিক আন্দোলন। এই বিষয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গেও কথা বলা উচিত।

শহীদ কবির নামে এক চাকরিজীবী বলেন, সরকারের আরো আগেই উচিত ছিলো দুর্ঘটনার জন্য কঠোর আইন করা। বারবার একই ঘটনা ঘটলে সেটা দুর্ঘটনা নয়। দুই বাস পাল্লা দিতে গিয়ে পথচারীদের উপর বাস উঠিয়ে দেয়া এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ওভারটেক করা এটা কি দুর্ঘটনা?

কুড়িল চৌরাস্তায় দেড়ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আসাদুল ইসলাম জানান, মিরপুর যাবো। দেড়ঘণ্টা ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়্ আছি, একটা বাসেরও দেখা নাই। আশপাশে কোথাও হলে পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায় চড়েই যেতাম।

বেলা ৯টার দিকে নতুন বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শত শত মানুষ রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। এদের মধ্যে অনেকেই রিকশা বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে গন্তব্যে গেলেও অধিকাংশ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, যাদের সার্মথ্য আছে তারা রিকশা অথবা মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আমরা যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করি। তাদের আজ অফিসে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নাই!

নতুনবাজার থেকে রামপুরাগামী রিকশাযাত্রী আলতাফ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে চালকরা।

মিরপুর থেকে রাইড শেয়ারিং অ্যাপস ব্যবহার করে মোটরসাইকেলে চড়ে নিয়মিত নতুনবাজার আসেন আসলাম মিয়া। তবে রোববার ও সোমবার অ্যাপসের মাধ্যমে মোটরসাইকেল না পেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া চুক্তিতে গন্তব্যে এসেছেন তিনি। উবার ও পাঠাও-এর মতো রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের মোটরসাইকেল চালকরা অ্যাপস বন্ধ রেখে চুক্তিতে দুই-তিন গুণ ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছেন বলে অভিযোগ করেন আসলাম মিয়া।

গতকাল রোববার মোটরসাইকেলের চালক, ব্যক্তিগত গাড়ির চালক কিংবা আরোহীদের মুখেও পোড়া মবিল মেখে দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয় রাস্তায় পরিবহন নামা শ্রমিকরা। এটা নিয়ে গতকাল থেকে চলছে সামাজিক গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া দেশব্যাপী ধর্মঘট শান্তিপূর্ণভাবে চলছে।

যাত্রাবাড়ীতে একটি প্রাইভেট কারের চালকের মুখে কালো পোড়া মবিল দেয়ার ঘটনায় দুই পরিবহন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে শ্রমিকরা যে আট দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন, সেই দাবি এখনই পূরণ করা সম্ভব নয় বলে গতকাল রোববার জানিয়ে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, শ্রমিক নেতারা আইনটি ভালোভাবে না পড়েই আন্দোলনে নেমেছেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও আইনটি সংশোধন করা বা শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান।

পরিবহন শ্রমিকদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সড়ক দুর্ঘটনার সব অপরাধ জামিনযোগ্য করা, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান বাতিল করা, সড়ক দুর্ঘটনায় গঠিত যেকোনো তদন্ত কমিটিতে ফেডারেশনের প্রতিনিধি রাখা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি নির্ধারণ এবং সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ করা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*