আওয়ামী দুঃশাসন হটিয়ে বিএনপির দুঃশাসন চাই না

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

* সাক্ষাৎকারে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে একটি বিকল্প বাম রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লড়াই করছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। আমন্ত্রণ পেয়েও আওয়ামী লীগ- বিএনপি বা ড. কামাল হোসেনের মোর্চায় শরিক না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বর্তমান সরকার সম্পর্কে মূল্যায়ন, বিএনপি ও ড. কামালের অবস্থান এবং চলমান রাজনীতি নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

প্রশ্ন : আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান শাসন আমলকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : টানা প্রায় ১০ বছর দেশ শাসন করছে আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের শাসন আমলে সাফল্য যে নেই তা বলা যাবে না, আছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটি বড় সাফল্য। তবে আবার এটা ভুলে গেলে চলবে না যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার কিন্তু ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদ- হয়েছিলো। সেই দ-াদেশের বিরুদ্ধে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের মুখে সরকার আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছিলো। এরপর রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ হয়।

কিন্তু সমাজে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে স্পর্শ করে এমন সব বিষয়ে সরকারের ভূমিকা গণবিরোধী। দেশে সম্পদ বেড়েছে তবে সে সম্পদ সমবণ্টিত না হয়ে এর ৯৫ শতাংশ কুক্ষিগত করতে দেয়া হয়েছে। মাত্র ৫ শতাংশ সম্পদের সুবিধা ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। ফলে আপেক্ষিক দারিদ্র্য বাড়তে বাড়তে এখন তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজে নৈরাজ্য, অনিশ্চয়তা, অপরাধ, সন্ত্রাস, গুম, খুন ও ধর্ষণ অবাধে চলছে।

একদিকে লুটপাট, অন্যদিকে গণতন্ত্রহীনতা। সম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচড়া দিয়ে উঠছে। সরকার সাম্প্রদায়িকতা মোকাবেলার বদলে তাকে নানা কনসেশন দিয়ে তোয়াজ করার নীতি অনুসরণ করছে। দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। এদের স্বার্থ রক্ষায় তারা বিএনপির চেয়েও অধিকতর সক্ষম তা প্রমাণে ব্যস্ত।

এটা এ কারণে করছে যে, ক্ষমতায় থাকতে হলে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের সমর্থন দরকার। বিএনপি আমলের দুঃশাসন থেকে এ আমলের দুঃশাসনের ফারাক উনিশ-বিশ। আওয়ামী লীগ একসময় ছিলো মধ্যবিত্তের পরিচালিত দল। বর্তমান আওয়ামী লীগের শ্রেণি চরিত্রের বদল ঘটেছে। দলটি এখন লুটেরা ধনিক শ্রেণির পরিচালিত দল। বঙ্গবন্ধুর সময়কালে আওয়ামী লীগ কিছুটা সময়ের জন্য মধ্য-ডানপন্থা অবলম্বন করলেও এখন সেই দলটি পুরোপুরি ডানপন্থী দলে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন : দ্বিদলীয় ধারার বিপরীতে জনসম্পৃক্ত প্রগতিশীল কোনো রাজনৈতিক ধারা কী কারণে গড়ে উঠছে না?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এর পেছনে আছে দেশি-বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর নীলনকশা। তারা নানা কৌশলে দেশকে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ধারায় আটকে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তারা সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়কে নিয়ন্ত্রিত রেখে তাদের শোষণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে।

কারণ দুটি দলেরই ধারা এক। অন্য দলগুলোকে এই মেরুর বলয়ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের ফাঁদে যারা পা দেয়নি সেসব দল ও শক্তিকে নানাভাবে মার্জিনালাইজ করে রাখার পদক্ষেপ তারা নিয়েছে। বিকল্প শক্তি চলতি হাওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে উজান স্রোতের পথে চলতে হচ্ছে, এটা খুবই কঠিন কাজ। আমরা সে কর্তব্য পালনের চেষ্টা করছি। অগ্রগতি আছে তবে তা এখনো দৃশ্যমান করে তুলতে পারিনি এখানেই আমাদের ঘাটতি।

প্রশ্ন : তাহলে বাম রাজনীতিকে কী ব্যর্থ মনে করছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : না। বাম রাজনীতি তো ব্যর্থ নয়-ই বরং একমাত্র বাম রাজনীতি গ্রহণের মাধ্যমেই দেশকে অবক্ষয়ের বিপজ্জনক পরিণতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। ডানপন্থীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা তো দূরের কথা এমনকি সাধারণ ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ও নিরাপদ নয়।

প্রশ্ন : ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঐক্যকে কিভাবে দেখছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো তাঁরা বিএনপিকে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে স্বাধীন বিকল্প হিসেবে ভূমিকা পালনের বদলে তারা দুঃশাসনের একটি কেন্দ্র বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে দুঃশাসনের অন্য কেন্দ্র আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করছেন।

এতে দেশ এক দুঃশাসন থেকে আরেক দুঃশাসনের কবলে পড়বে। এই মিউজিক্যাল চেয়ারখেলা বারবার ঘটছে। এই চক্র থেকে দেশকে বের করে আনতে হলে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুঃশাসনের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

প্রশ্ন : দুই জোটই নাকি আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমাদের কদর তো বেড়েছেই। কিন্তু আমরা আওয়ামী দুঃশাসনের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রাম করছি। একই সঙ্গে বিএনপির দুঃশাসনের প্রতিস্থাপনও আমরা ঠেকাতে চাই। আমরা এই বৃত্তের বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার কাজ করছি।

প্রশ্ন : আপনাদের জোটের সিদ্ধান্ত ছিলো ড. কামাল হোসেনের সভায় না যাওয়ার। কিন্তু জোনায়েদ সাকি তো গিয়েছিলেন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : হ্যাঁ, আমাদের বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিদ্ধান্ত ছিলো ড. কামাল হোসেনের সভায় না যাওয়ার। জোনায়েদ সাকি সেখানে গিয়ে বক্তৃতা করেছেন। এ নিয়ে আমাদের জোটের ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে জোট টিকে আছে এবং এটাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।

প্রশ্ন : সরকার নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি না মানলে কী করবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংগ্রাম করছি, করবো। আমাদের রাজনীতি শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক বিবেচনা থেকে পরিচালিত নয়। বর্তমান সময়ের দুঃশাসনের অবসান ও বিকল্প বাম শক্তি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

সে লক্ষ্যে পরিচালিত আমাদের বহুমাত্রিক সংগ্রামের একটি হলো নির্বাচন। সে লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে অবস্থা অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বর্জন এই দুইয়ের মধ্যে যেটা উপযুক্ত সেটা আমরা বেছে নেবো। তবে এখন আমরা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে সংগ্রাম করছি।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় এক-এগারোর মতো কিছু ঘটতে পারে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তির বিন্যাস খুব নাজুক অবস্থায় আছে। বুর্জোয়া শাসনের দেউলিয়াপনা ও ব্যর্থতা এই নাজুকতাকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বুর্জোয়া শাসকদের ওপর সা¤্রাজ্যবাদী ও অধিপত্যবাদী শক্তির প্রভাব বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণহীন মাত্রায় চলে গেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশে যেকোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সৌজন্যে কালের কণ্ঠ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*