২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
ইতিহাসের ভয়াবহতম ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ বুধবার ( ১০ অক্টোবর)। ১৪ বছর বিচারিক কার্যক্রম শেষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দীন রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে এই মামলায় জামিনে থাকা আট আসামির জামিন নামঞ্জুর করে সবাইকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই আট আসামির মধ্যে সাবেক দুই আইজিপি আশরাফুল হুদা এবং শহুদুল হকও রয়েছেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর সাইফুল ইসলাম ডিউকের পক্ষে যুক্তি দেন আব্দুর রেজ্জাক খান ও খন্দকার মাহবুব হোসেন। আর বেলা ১টা ৫৩ মিনিটের দিকে রায়ের তারিখ জানান বিচারক। এই মামলার ৫২ জন আসামিদের মধ্যে আছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টু, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ডিউক। আসামিদের মধ্যে জামাত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জঙ্গিনেতা মুফতি মোহাম্মদ হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য মামলায়। ফলে ৪৯ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হবে ১০ অক্টোবর।

বিএনপি-জামাত জোট সরকারে থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্য জনসভায় নজিরবিহীন হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৩ জন নিহত এবং কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হন। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সে সময়কার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ছোড়া গ্রেনেড থেকে নেতারা তাকে রক্ষা করেন মানববর্ম বানিয়ে। নেত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেন তার একজন দেহরক্ষী। ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। জোট সরকারের আমলে প্রকৃত হামলাকারীদের বাঁচিয়ে নির্দোষ জজ মিয়াকে আসামি করার প্রমাণ মেলে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আরেকবার তদন্ত হয় মামলাটির। আর তদন্তের ফেরে প্রায় আট বছর কাটার পর ২০১২ সালের ১৮ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আদালতে মামলার বিচার চলছে। মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৫১১ জনকে সাক্ষী করলেও শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য দেন ২২৫ জন। আর গত বছরের ৩০ মে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দের জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

আসামি সংখ্যা
ওই ঘটনায় হত্যা, হত্যা চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, ঘটনায় সহায়তাসহ বিভিন্ন অভিযোগে একটি মামলা যাতে আসামী সংখ্যা মোট ৫২ জন (ইতোমধ্যে অন্য মামলায় তিন আসামীর মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ায় এখন আসামি ৪৯ জন)। একই ঘটনায় ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে (সংশোধনী-২০০২) অপর একটি মামলায় আসামি সংখ্যা ৩৮জন। ওই ঘটনায় হত্যা, হত্যা চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, ঘটনায় সহায়তাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আনা মামলায় ৫২ আসামি হলেন- ১. মুফতি আবদুল হান্নান ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান (অন্য মামলায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর) ২. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি ৩. শরিফ শাহেদুল আলম বিপুল (অন্য মামলায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর) ৪. মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর ৫. আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল ৬. মো.জাহাঙ্গীর আলম ৭. হাফেজ মাওলানা আবু তাহের ৮. শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল ৯. হোসাইন আহম্মেদ তামিম ১০. আব্দুস সালাম পিন্টু ১১. মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ১২.আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক ১৩. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ১৪. মো. উজ্জল ওরফে রতন ১৫. হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ১৬. মো.লুৎফুজ্জামান বাবর ১৭. মেজর জেনারেল (অব:) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ১৮. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুর রহিম ১৯.আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (অন্য মামলায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর) ২০. মাওলানা শেখ আব্দুস সালাম ২১. মো. আব্দুল মাজেদ ভাট ২২. আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ২৩. মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব ২৪. মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির ২৫. মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ. ২৬. অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি মো: আশরাফুল হুদা ২৭. অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি শহুদুল হক ২৮. অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী ২৯. রুহুল আমীন, বিশেষ পুলিশ সুপার (অব:) ৩০. আব্দুর রশিদ অবসরপ্রাপ্ত এএসপি ৩১. মুন্সী আতিকুর রহমান অবসরপ্রাপ্ত এএসপি ৩২. লে.কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক ৩৩. মাওলানা মো.তাজউদ্দিন ৩৪. মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন ৩৫. আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন ৩৬. মো. খলিল ৩৭. জাহাঙ্গির আলম বদর ৩৮. মো.ইকবাল ৩৯. আবু বক্কর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ৪০. লিটন ওরফে মাওলানা লিটন ৪১. তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া ৪২. হারিছ চৌধুরী ৪৩. কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ৪৪. হানিফ পরিবহনের মালিক হানিফ ৪৫. লে.কর্নেল (অব:) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার ৪৬. মেজর জেনারেল এ,টি,এম, আমিন (এলপি আর) ৪৭. মুফতি শফিকুর রহমান ৪৮. মুফতি আব্দুল হাই ৪৯. রাতুল আহাম্মদ বাবু ওরফে রাতুল বাবু ৫০. ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ৫১. পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খান ৫২. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ কমিশনার। এদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি মো: আশরাফুল হুদা, অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি শহুদুল হক, অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমীন, বিশেষ পুলিশ সুপার (অব:), আব্দুর রশিদ অবসরপ্রাপ্ত এএসপি, মুন্সী আতিকুর রহমান অবসরপ্রাপ্ত এএসপি, লে.কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক. লে.কর্নেল (অব:) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, মেজর জেনারেল এটিএম আমিন (এলপিআর), ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খানসহ এ ১১ জনের বিরুদ্ধে ২১ আগষ্টের একই ঘটনায় ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে (সংশোধনী-২০০২) অভিযোগ আনা হয়নি।

কারাগারে আছেন যারা
গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এরর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, বিএনপি নেতা লুৎফজ্জমান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুলস সালাম পিন্টু বিচার শুরুর আগে থেকেই কারাগারে। জঙ্গি সদস্য শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, শেখ আবদুস সালাম, আবদুল মাজেদ ভাট, ইউছুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা ওরফে জিএম, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর ওরফে আবু হুমাইয়া ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিব উল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সায়ীদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গির আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামীম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আবিদ হাসান সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামীম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জল ওরফে রতন ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়াও বন্দী আছেন।

জামিনে যারা
রায়ের তারিখ ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই মামলায় জামিনে ছিলেন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক আইজিপি খোদাবক্স, সিআইডির সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ ও ঢাকা মহানগরীর ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ।

পলাতক রয়েছেন যারা
তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল এটিএম আমিন আহমদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান পলাতক রয়েছেন। এছাড়াও জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা তাজ উদ্দিন, মাওলানা মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিন, মোহাম্মদ খলিল, জাহাঙ্গির আলম বদর, ইকবাল, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ লোকমান হাওলাদার, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, মুফতি শফিকুর রহমান, রাতুল আহমেদ বাবু ওরফে রাতুল বাবুকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি। এদের মধ্যে দুই আনিসুল মোরসালিন ও মহিবুল মুত্তাকিন ভারতের তিহার কারাগারে আটক রয়েছেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.