বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, তারেকসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপি-জামাত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ দেয়া হয়েছে। আজ বুধবার (১০ অক্টোবর) পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর এবং এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রথম অভিযোগপত্র দাখিলের ১০ বছর পর রায় ঘোষণা হলো। এই মামলার মোট ৫২ আসামির মধ্যে তিনজনের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিব্বুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মাইন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মাইন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তখনকার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.), হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক হানিফ।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল (উপস্থিত), মাওলানা আবদুর রউফ ওরফের আবু ওমর আবু হোমাইরা ওরফে পীরসাহেব (উপস্থিত), মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির (উপস্থিত), আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া (উপস্থিত), আবু বকর ওরফে হাফে সেলিম হাওলাদার (উপস্থিত), মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (উপস্থিত), মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর ওরফে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) এবং রাতুল আহম্মেদ বাবু ওরফে বাবু ওরফে রাতুল বাবু (পলাতক)।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শেষে রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আসামিপক্ষ সব আসামির বেকসুর খালাস দাবি করে। সেদিনই এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য তারিখ ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষে ৫১১ জনের মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মোট আসামি ছিলেন ৫২ জন। এই মামলার বিচার চলাকালে আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। বর্তমানে মামলা দুইটিতে আসামির সংখ্যা ৪৯ জন।

এই মামলায় মোট ৩১ জন আসামি কারাগারে থাকলেও বাকি ১৮ জন পলাতক। আর আসামিদের মধ্যে আটজন জামিনে থাকলেও রায়ের দিন নির্ধারণ করার আগে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে আটক রাখার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার সময় পলাতক ১৮ জন ছাড়া বাকি ৩১ আসামির সবাইকে আদালতে হাজির করা হয়।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ২৫ কার্যদিবস পদ্ধতিগত বিষয়ের ওপর যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা চলতি বছর ১ জানুয়ারি শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ সরকারি কর্মকর্তার সাত বছর কারাদণ্ড দাবি করেন।

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত মোট ১১৯ কার্যদিবস যুক্তি উপস্থান হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ নিয়েছে ২৯ কার্যদিবস আর আসামিপক্ষ নিয়েছে ৯০ কার্যদিবস।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলায় আওয়ামী লীগের ওই সময়ের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ভয়াবহ ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও শ্রবণশক্তি হারান। আহত হন আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী।

এ ঘটনায় মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক তিনটি এজাহার দায়ের করেন। মামলাটিতে ২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে সিআইডি। ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। ফলে মোট আসামি দাঁড়ায় ৫২ জনে।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক অভিযোগপত্রের ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের করার পর ফের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সব মিলিয়ে মামলার রাষ্ট্রপক্ষের মোট ৫১১ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ২২৫ জন জন। গত ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দকে আসামিপক্ষের জেরার মধ্য দিয়ে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

গত ১২ জুন থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত কারাগারে ও জামিনে থাকা ৩১ অসামির পরীক্ষা শেষে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করেন তারা। গত ১২ জুলাই থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ওই ৩১ আসামির আসামির পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ৩১ জন সাক্ষী।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*