‌‘একতরফা নির্বাচন রুখে দাঁড়ান’

* সিপিবির জনসভায় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
* দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট শাসকশ্রেণি দুই দলে বিভক্ত হয়ে দেশে দুঃশাসন চালিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রিক দ্বিদলীয় ধারা দেশে দুঃশাসনকে পোক্ত করছে। মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দুঃশসনের অবসান ঘটানো জরুরি।আজ শুক্রবার (৫ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে সিপিবি আয়োজিত এক জনসভায় দেয়া সভাপতির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারার অভিযোগ এনে এ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। বর্তমান শাসনকালকে ‘দুঃশাসন’ উল্লেখ করে এর অবসানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিসহ সাধারণ জনগণকে ‘বাম বিকল্প শক্তি’ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান সিপিবি সভাপতি।

ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, স্বৈরশাসকেরা নির্বাচন বিষয়টাকে প্রহসনে পরিণত করেছিলো। নব্বইপরবর্তী সরকারগুলোও অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। বর্তমান সরকার আরো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে নির্বাচনকে ‘ঐন্দ্রজালিক প্রহসনে’ পরিণত করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একতরফা নির্বাচনে পরিণত করার জন্য সরকার অপচেষ্টা শুরু করেছে। এই অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে দেশবাসীকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। সিপিবি সভাপতি অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগ, রাজনৈতিক দল ও সমাজের অপরাপর অংশের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া, জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি চালুসহ কালোটাকার খেলা ও পেশিশক্তিনির্ভর বিদ্যমান গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এ সরকার মানুষের মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ প্রণয়ন করেছে। এ আইনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের লুটপাট, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠকে গলা টিপে দাবিয়ে দেয়া হবে। জেল-জরিমানার ভয় দেখিয়ে সংবাদপত্রকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হবে। এ আইন বিরোধীপক্ষকে দমন করার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুমোদন না করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানান।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বর্তমান আওয়ামী সরকার প্রায় ১০ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় আছে। তারা ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তাদের সরকারের আমলে ভাত ও ভোটের অধিকার খর্বিত হয়েছে ন্যাক্কারজনকভাবে। ‘১০ টাকা কেজি’ চাল দেয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি। উন্নয়নের নামে শাসকদলের সীমাহীন লুটপাট, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশ। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ রুদ্ধ। গুম, খুন, জেল, জুলুম, দমন-পীড়নের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে পিষ্ট দেশ। খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন বিভৎস পর্যায়ে পৌঁছেছে। সড়কে মুত্যুর মিছিল চলছে। বেকারত্বে যন্ত্রণায় নিষ্পেষিত হচ্ছে কোটি কোটি যুবক। মালিকদের খুশি করার জন্য গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবি উপেক্ষিত। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। মানুষের সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার সরকারের ইচ্ছাধীন করা হয়েছে। প্রশাসন ও দলীয় ক্যাডারবাহিনীর মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে দমন করা হচ্ছে। এক অসহনীয় পরিস্থিতি অতিক্রম করছে দেশের মানুষ।

মুক্তিযোদ্ধা সেলিম বলেন, সিপিবি বর্তমান আওয়ামী দুঃশাসন অবসানের জন্য জানকবুল করে লড়াই করছে। জেল, জুলুম মোকাবিলা করে রাজপথে লড়াইয়ে রয়েছে। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম চালানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেন্দ্রিক দ্বিদলীয় ধারার বাইরে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যকে সমভাবে এগিয়ে নিতে আমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এ দুটি হলো সংগ্রামের এই পর্বের যুগপৎ কর্তব্য। একটি কাজ আগে শেষ করে নেওয়ার কথা বলে অপর কাজটিকে স্থগিত রাখা হবে ভুল। তিনি বলেন, ‘বিকল্প’ শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে ‘বিকল্প’ নীতিতে দেশ পরিচালনা ব্যতীত ‘দুঃশাসনের’ অবসান ঘটানো সম্ভব না। তিনি প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, সাতক্ষীরার বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতা নিত্যানন্দ সরকার, খগেন্দ্র নাথ ঘোষ ও প্রশান্ত রায়ের অবিলম্বে কারামুক্তি দাবি করেন।

জনসভায় সিপিবি সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি দেশের জনগণের বিরুদ্ধে শাসকশ্রেণির পরিচালিত প্রতিটি আক্রমণ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। শুধু রুটি-রুজির সংগ্রাম নয়- অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য রাজপথে লড়াই করছে। এ আন্দোলনে আমাদের কর্মীদের রক্ত ঝরেছে। তিনি বলেন, সিপিবির নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি যেমন আছে, তেমনই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করার চেষ্টা করলে সিপিবি নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। তিনি সিপিবিকর্মীদের অন্য বামপন্থীদের সঙ্গে নিয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের জন্য রাজপথে লড়াই গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

‘দুঃশাসন হঠাও, গণতন্ত্র বাঁচাও, দ্বিদলীয় মেরুকরণের বাইরে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলো’- এই আহ্বান জানিয়ে সিপিবি আজ এই জনসভার আয়োজন করে। এতে অন্যান্যের মধ্যে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, জলি তালুকদার, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এডভোকেট মন্টু ঘোষ ও ডা. সাজেদুল হক রুবেল বক্তৃতা করেন। সভা পরিচালনা করেন পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। জনসভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য লক্ষ্মী চক্রবর্তী, শাহীন রহমান, অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, সম্পাদক আহসান হাবীব লাবলু, কোষাধ্যক্ষ মাহাবুব আলম, ঢাকা কমিটির সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে বিশাল ‘লাল পতাকা’ মিছিল পুরানা পল্টন, গুলিস্তান, বংশাল ঘুরে পুরানা পল্টনের কমরেড মণি সিংহ সড়কের সিপিবি কার্যালয় মুক্তি ভবনের সামনে এসে শেষ হয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.