‘সু চির ভূমিকা দুঃখজনক, তবে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার নয়’

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির ভূমিকা ‘দুঃখজনক’ হলেও তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেন।

শুক্রবার স্টকহোমে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পুরস্কার দেয়ার পরের কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তা কেড়ে নেওয়ার মানে হয় না। সেটা করতে হলে পুরস্কারপ্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে বিচারকদের সব সময় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমারে গণতন্ত্রের দাবিতে অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান সু চি। মিয়ানমার বেসামরিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরলে ২০১৫ সালে নির্বাচনে জিতে সু চি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হন। মিয়ানমারের বেসামরিক প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন সু চিরই হাতে। তবে সাংবিধানিকভাবে সেনাবাহিনী এখনো বিপুল ক্ষমতাধর।

গত বছর অগাস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরুর পর তা ঠেকানোর কোনো চেষ্টা না করে উল্টো সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে পড়েন মিয়ানমারের ‘ডি ফ্যাক্টো’ নেত্রী।

এ বিষয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান হেইকেনস্টেন বলেন, ‘মিয়ানমারে সু চি যা করছেন তা যে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ, তা আমরা দেখছি। আমরা মানবাধিকারের পক্ষে, এটা আমাদের অন্যতম প্রধান মূল্যবোধ। অবশ্যই বিস্তৃত অর্থে তিনি এর (রাখাইনে দমনপীড়ন) জন্য দায়ী, যা খুবই দুঃখজনক।’

রাখাইনে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে গত এক বছরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নাফ নদীর দুই তীরে সৃষ্টি হয়েছে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সঙ্কট।

গত মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘গণহত্যার অভিপ্রায়’ থেকেই রাখাইনের অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়েছে। আইন প্রয়োগের নামে ভয়ঙ্কর ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করারও সুপারিশ করেছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মনে করে, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া সু চি বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় তার ‘নৈতিক কর্তৃত্ব’ ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছেন।

সেখানে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির বেসামরিক সরকার ‘বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উসকে’ দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ‘আলামত ধ্বংস’ করেছে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে ‘ব্যর্থ হয়েছে’। আর এর মধ্যে দিয়ে মিয়ানমার সরকারও নৃশংসতায় ‘ভূমিকা’ রেখেছে।

বড় ধরনের কোনো অপরাধের কথা স্বীকার না করলেও সু চি গত মাসে এক অনুষ্ঠানে বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতি হয়তো আরো ভালোভাবে সামলানো যেতো।

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধে নিষ্ক্রিয়তার জন্য এক সময়ের পশ্চিমা মিত্ররাও এখন সু চির সমালোচনায় মুখর। অহিংস আন্দোলনের জন্য এক সময় তাকে যেসব পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়া হয়েছিলো, গত দেড় বছরে তার অনেকগুলোই প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের শেষে কানাডার পার্লামেন্টও সু চিকে দেওয়া সম্মানসূচক নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে তাকে দেয়া শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহারের কোনো উদ্যোগ ‘অর্থপূর্ণ’ কিছু হবে বলে মনে করেন না নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রধান লারস হেইকেনস্টেন।

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই পুরস্কার পাওয়ার পর অনেকে এমন কিছু করেন যা আমরা অনুমোদন করতে পারি না। সেগুলো যে ঠিক- তাও মনে করি না। আগেও এমনটা হয়েছে, সবসময়ই হবে। এটা এড়ানো যাবে না বলেই আমার মনে হয়।’

স্টকহোমভিত্তিক এ ফাউন্ডেশনই ছয়টি বিভাগে সুইডেন ও নরওয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার দেয়ার বিষয়টির তদারক করে থাকে। শান্তিতে নোবেল দেওয়ার দায়িত্বে থাকা নরওয়ের নোবেল কমিটি আগেই জানিয়েছিল, একবার পুরস্কার দেয়ার পর তা কেড়ে নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। আগামী শুক্রবার অসলোতে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.