শেষ বলে আরেকটি শিরোপার স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের

স্পোর্টস ডেস্ক, পিটিবিনউজ.কম
এশিয়া কাপের আরেকটি ফাইনাল আরেকটি আক্ষেপের গল্প লিখেই শেষ করলো বাংলাদেশ। অথচ দুবাইয়ের রাতটা অন্য রকম হতে পারতো। সেই সম্ভাবনা ছিলো ব্যাটিংয়ের সূচনাতে। ছিলো বোলিংয়ে। ছিলো জান লড়িয়ে দেয়া ফিল্ডিংয়ে। কিন্তু বিনা উইকেটে ১২০ রান থেকে ২২২ রানে অলআউট হওয়ার প্রায়শ্চিত্ত বাংলাদেশ প্রায় করেই ফেলেছিলো। বোলাররা শুরু থেকে প্রতিটা রানের জন্য ভারতকে লড়াই করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু টুর্নামেন্টের ট্রফিটা যে বাংলাদেশের জন্য অধরা থেকে যাবে বলেই নিয়তি ঠিক করে রেখেছে! শেষ ওভারে ম্যাচটা টেনে নিয়ে গিয়ে, ভারতের সেরা ব্যাটসম্যানদের আগেই সাজঘরে ফিরিয়েও বাংলাদেশ পারলো না। শেষ বলে বাংলাদেশকে হারিয়ে সপ্তমবারের মতো এশিয়া কাপ জিতলো ভারত।

সংশয় ছিলো অল্প পুঁজি। ভারতের দুর্ধর্ষ ব্যাটিং। একপেশে ফাইনাল হবে না তো? কিন্তু না, ফাইনাল হলো ফাইনালের মতোই। ২২২ রান নিয়েও অবিশ্বাস্য লড়েছেন মাশরাফিরা। শেষের দিকে চরম উত্তেজনা আর নাটকের পর শেষ বলে হলো ফয়সালা। তিন উইকেটে মনে রাখার মতো ফাইনাল জিতে আবারও এশিয়া কাপ ঘরে তুললো ভারত।

ভাগ্য সঙ্গে থাকলে জিততে পারত বাংলাদেশও। কিন্তু ফের স্বপ্নভঙ্গ। এই নিয়ে তৃতীয়বার এশিয়া কাপের ফাইনালে হেরে গেলো বাংলাদেশ। গত মার্চে শ্রীলঙ্কায় ত্রিদেশীয় নিদাহাস ট্রফির ফাইনালেও শেষ বলে ভারতের কাছে হেরেছিলো বাংলাদেশ।

ভারতের সামনে ছিলো ২২৩ রানের সহজ টার্গেট। এশিয়া কাপে ভারতের যা ফর্ম, তাতে ম্যাচ শেষ হবে কত আগে, কত ওভার বাকি থাকতে- এই হিসেবই কষছিলেন সবাই। কিন্তু ম্যাচে সমান তালে লড়েন মাশরাফিরা। পুরো ম্যাচে বজায় থাকলো উত্তেজনা।

ব্যাট করতে নেমে শুরুতে অবশ্য চড়াও ছিলেন ভারতীয় দুই ওপেনার। তবে ধাওয়ানকে বেশিদূর যেতে দেননি লেগ স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপু। ১৪ বলে ১৫ করার পর তাকে ফিরতে হয় সৌম্যর ক্যাচ হয়ে। এরপরপরই আম্বাতি রায়ুডুকে ২ রানে বিদায় করে ম্যাচ জমিয়ে দেন অধিনায়ক মাশরাফি।

কিন্তু রোহিত শর্মা যখন উইকেটে তখন তো আশাবাদী হওয়ার তেমন কারণ থাকে না। দীনেশ কার্তিককে নিয়ে দ্রুত রান করতে থাকেন রোহিত। দ্রুত ফেরানো দরকার ছিলো তাকে। তবে একটু দেরিতে হলেও ৪৮ রানে রোহিতকে বিদায় করে স্বস্তি আনেন পেসার রুবেল হোসেন। ভারতের রান তখন ১৬.৪ ওভারে ৩ উইকেটে ৮৩।

গত মার্চে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে দীনেশ কার্তিকের বীরত্বর কাছে শেষমেশ হারতে হয়েছিলো বাংলাদেশকে। এদিনও দাড়িয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে অভিজ্ঞ ধোনি। কার্তিককে ৩৭ রানে রুবেল বিদায় করলেও ততক্ষণে একটু দেরি হয়ে গেছে।

এরপর চিন্তার নাম ধোনি। খুব দ্রুত আউট করতে না পারলেও ধোনিকে ৩৬ রানে ফিরিয়ে ম্যাচ জমিয়ে দেন সেই মুস্তাফিজুর রহমান। ১৯ করার পর আহত হয়ে পাঠ ছাড়েন কেদার যাদব। ভারতের জন্য যেটা ছিলো বাড়তি চাপ।

রবিন্দ্র জাদেজার সঙ্গে উইকেটে ভুবনেশ্বর কুমার। ম্যাচে তখন রোমাঞ্চ। ফিফটি ফিফিটি সম্ভাবনা। গ্যালারিতে উত্তেজনা। ড্রেসিংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানদের টিপস দিচ্ছেন রোহিত শর্মা। উইকেটের জন্য প্রাণপণ লড়ছেন বাংলাদেশি বোলাররা।

কে জিতবে, বাংলাদেশ নাকি ভারত? তখন এই প্রশ্ন। কিন্তু জাদেজা বাংলাদেশকে চিন্তা বাড়িয়ে দেখেশুনে রান তুলতে থাকেন জাদেজা ও কুমার। অনেক চেষ্টার পর রুবেলের বলে জাদেজা যখন আউট হলেন ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

শেষ ১৬ বলে ভারতের দরকার ১১ রান। সমীকরণ সহজ হয়ে গেছে তাদের জন্য। ১২ বলে ভারদের দরকার ৯ রান। ৪৯তম ওভারের প্রথম বলে ভুবনেশ্বর কুমারকে (২১) বিদায় করে নাটকীয়তা আনেন মুস্তাফিজ। ওভার শেষ করেন মাত্র ৩ রান দিয়ে।

ম্যাচ গড়ায় শেষ ওভারে। উইকেটে ভারতের টেলএন্ডার। গুরু দায়িত্ব পড়লো অনিয়মিত বোলার রিয়াদের উপর। প্রথম দুই বলে দিলেন দুই রান। তৃতীয় বলে ২ রান। পরের বল ডট হলে ২ বলে ভারতের দরকার ২ রান। এক রান হলে টাই। পঞ্চম বলে লেগবাই থেকে ১ রান আসলে স্কোর লেভেলে এসে যায়। শেষ বলে চার নিয়ে ভারতকে নাটকীয় জয় এনে দেন কেদার যাদব।

এর আগে ওপেনার লিটন কুমার দাসের ১২১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস সত্বেও মিডল অর্ডারের শোচনীয় ব্যর্থতায় ৪৮.৩ ওভারে মাত্র ২২২ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। লিটন একাই করেন ১২১ রান, ১১৭ বলে। মিরাজ ৩২, সৌম্য ৩৩ । বাকি ৭ ব্যাটসম্যান মিলে করেন মাত্র ৩০ রান।

এমন হওয়ার কথা ছিলো না। তামিম নেই, কিন্তু সেটা টেরই পাওয়া যায়নি এদিন। লিটন কুমার দাস হয়ে গেলেন তামিম ইকবাল। তামিমের মতো ভয়ডরহীন ব্যাটিং। হাফ সেঞ্চুরি পেরিয়ে তুলে নেন দুর্ধর্ষ সেঞ্চুরি। ওয়ানডেতে একমাত্র সেঞ্চুরিটা পূরণ করেন ৮৭ বলে।

প্রথমবারের মতো ওপেনিংয়ে নামা মিরাজরে সঙ্গে জুটিটাও দারুণ জমে ওঠে তার। দুজনের ১২০ রানের পার্টনারশিপ। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির যেটা নতুন রেকর্ড।

২০১৫ সালে ঢাকাতে ভারতের বিপক্ষে তামিম-সৌম্য করেছিলেন ১০২। তিন বছর পর সেই ভারতের বিপক্ষে ১২০ রানের জুটি গড়ে নতুন রেকর্ড গড়েন লিটন ও মিরাজ। ৫৯ বলে ৩২ রান করে কেদার যাদবের বলে ফিরেন মিরাজ। তবে সৌম্যর জায়গায় মিরাজকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে যে বজিটা রেখেছিলেন, তাতে সফল অধিনায়ক মাশরাফি। ২০১৬ সালের পর এই প্রথম ওপেনিংয়ে শতরানের জুটি পেয়েছে বাংলাদেশ।

ফাইনালের একাদশে চমক থাকতে পারে, ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে একটা ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল মাশরাফির কথায়। কিন্তু মিরাজকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে সেই সারপ্রাইজটা দিয়ে বসবেন, কেউ ভাবেননি।দু:সাহসিক সিদ্ধান্ত।

১৬টি ওয়ানডে খেলেছেন। কিন্তু কখনওই পাঁচের উপরে ব্যাট করেননি। ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে সেই মিরাজকে নামিয়ে দেয়া হয় ওপেনিংয়ে! ওপনিংয়ে সৌম্য সরকারের আস্থার চরম অভাবের কারণেই আসলে এমন উল্টা-পাল্টা সিদ্ধান্ত টিম ম্যানেজমেন্টের। আগের ম্যাচে ওপেন করতে নেমে ০ তে আউট হন সৌম্য। তাকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে ফের দলের বিপদ বাড়ানোর ঝুকি না নিয়ে আরেকটা অন্য ঝুকি নেন মাশরাফি।

সেই অন্যঝুকিতে জিতলেও মাশরাফিকে হতাশ করেন মিডল অর্ডার। প্রতিপক্ষ ভারত, ম্যাচটা ফাইনাল। প্রথমবার ওপেনিংয়ে। মিরাজের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ ছিল মাশরাফির জন্যও। তবে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তে জয়ী মাশরাফি।

এশিয়া কাপের প্রতিটা ম্যাচেই প্রধান চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ওপেনাররা। ফাইনালের আগে লিটন মাত্র এক ম্যাচে রান করেছেন। ফাইনালের আগে চার ম্যাচে লিটনের ব্যাট থেকে আসে যথাক্রমে ০, ৬, ৭, ৪১, ৬।

তবে লিটনের যে সামার্থ আছে, এটা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আমেরিকাতে শেষ টি-টোয়েন্টি ৩২ বলে ৬১ করে দলকে জেতানো। তার আগেও ২০ ওভার ম্যাচে কয়েকটি ঝড়ো ইনিংসও ছিলো তার। টেস্টে ৭০ ও ৯৪ রানের দুটি ভালো ইনিংসও এসেছে তার ব্যাট থেকে।

তবে ১৮ ওয়ানডেতে একটিও হাফ সেঞ্চুরি না থাকাটা লিটনের জন্য ছিলো বিব্রতকর। ৩৪, ৩৬ এবং ৪১ পর্যন্ত গেলেও এগুলোকে হাফ সেঞ্চুরিতে পরিণত করতে পারেননি। ভালো খেলার মধ্যেই কেন যেন হুট করে আউট হয়ে যাচ্ছিলেন বারবার। অবশেষে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিলেন লিটন এবং তা ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে এসে।

মিরাজের সঙ্গে তার পার্টনারশিপটাও বেশ জমে ওঠে। এশিয়া কাপের আগের সবকটি ম্যাচেই দুই তিন উইকেট হারিয়ে শুরতেই বারবার চাপে পড়ে গেছে বাংলাদেশ।

তবে এদিন দলকে পথ দেখান লিটন ও মিরাজ। ১২০ রানের পার্টনারশিপ। ভারতকে হারাতে হলে কম করে ২৮০ রান দরকার। লিটন ও মিরাজের ব্যাটে সেই সম্ভাবনা জানান দিয়েছিল। কিন্তু ৩২ রানে মিরাজের বিদায়ের পর শুরু ছন্দপতন। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের অভাব নেই। কিন্তু আসল ম্যাচে ভয়াবহ ব্যর্থ হলেন তারা।

এমন উড়ন্ত শুরুর পরও ৩১ রানের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারিয়ে বড় স্কোরের আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়। ইমরুল (২), মুশফিক (৫), মিথুন (২) ও মাহমুদউল্লাহ- এই চারজনের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১৩ রান! টপাটপ উইকেট পড়ে যাওয়ায় রানের গতিও থমকে যায়!

২০.৫ ওভারে ১২০/০ থেকে ৩২.২ ওভারে ১৫১/৫। ৫০ ওভার খেলাটাই তখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একজন কম ব্যাটসম্যান নিয়ে একাদশ সাজিয়েছে বাংলাদেশ। উইকেটে শেষ স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান লিটন ও সৌম্য। যা করার করতে হবে এ জুনকেই।

সে লক্ষ্য নিয়েই তারা ব্যাট করছিলেন। কিন্তু ১২১ করার পর টিভি আম্পায়ার রড টাকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে স্ট্যাম্পিং হয়ে ফিরতে হয় লিটনকে। এরপর মাশরাফিকেও ৭ রানে ফিরতে হয় আরেক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে।

ওপেনিংয়ে টানা ব্যর্থতার পর এদিন লোয়ার মিডল অর্ডারে নেমে আস্থার সঙ্গে রান করেন সৌম্য সরকার। কিন্তু ৪৫ বলে ৩৩ করার পর রান আউট হয়ে গেলে ৪৮.৩ ওভারে বাংলাদেশ থামে ২২২ রানে। ভারতের কুলদিপ যাদব তিনটি ও কেদার যাদব ২ উইকেট নেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ফল: তিন উইকেটে জয়ী ভারত।

বাংলাদেশ ইনিংস: ২২২ (৪৮.৩ ওভার)

(লিটন দাস ১২১, মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২, ইমরুল কায়েস ২, মুশফিকুর রহিম ৫, মোহাম্মদ মিথুন ২, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ৪, সৌম্য সরকার, মাশরাফি বিন মুর্তজা ৭, নাজমুল ইসলাম অপু ৭, মোস্তাফিজুর রহমান ২, রুবেল হোসেন ০*; ভুবনেশ্বর কুমার ০/৩৩, জ্যাসপ্রীত বুমরাহ ১/৩৯, যুজবেন্দ্র চাহাল ১/৩১, কুলদীপ যাদব ৩/৪৫, রবীন্দ্র জাদেজা ০/৩১, কেদার যাদব ২/৪১)।

ভারত ইনিংস: ২২৩/৭ (৫০ ওভার)

(রোহিত শর্মা ৪৮, শিখর ধাওয়ান ১৫, আম্বাতি রায়ডু ২, দিনেশ কার্তিক ৩৭, মহেন্দ্র সিং ধোনি ৩৬, কেদার যাদব ২৩*, রবীন্দ্র জাদেজা ২৩, ভুবনেশ্বর কুমার ২১, কুলদীপ যাদব ৫*; মেহেদী হাসান মিরাজ ০/২৭, মোস্তাফিজুর রহমান ২/৩৮, নাজমুল ইসলাম অপু ১/৫৬, মাশরাফি বিন মুর্তজা ১/৩৫, রুবেল হোসেন ২/২৬, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১/৩৩)।

প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: লিটন দাস (বাংলাদেশ)।

প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: শিখর ধাওয়ান (ভারত)।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.