উচ্ছেদ অভিযানকালে ভুলক্রমে মন্দির ভেঙে আবার নির্মাণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ভবন

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে ভুলক্রমে নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়াম সংলগ্ন মহামায়া মগ্ধেশ্বরী মায়ের সেবা খোলা মন্দির ভেঙে ফেলেছে। পরে স্থানীয় হিন্দুদের ক্ষোভের মুখে তা আবার নির্মাণ করে দিচ্ছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

সোমবার দুপুরে সিটি করপোরেশনের অভিযানের মধ্যে সেবা খোলা মন্দির ভেঙে ফেলার পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিকেলে মন্দির ভাঙার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পূজা উদযাপন পরিষদ এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে যান।

পরে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে মন্দির পুননির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। এর প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার সকালে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে সেবা খোলাটি নতুন করে নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের অভিযোগ, ধর্মীয় ওই স্থাপনা ভাঙা হয়েছে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’। তবে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মেরামতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলরের দাবি, বুলডোজারের ‘চালকের ভুলে’ সেবা খোলা মন্দিরের অংশবিশেষ ভাঙ্গা পড়েছে।

নগরীর পাহাড়তলি থানার সাগরিকা মোড় থেকে রাস্তার দুপাশে অবৈধ দোকনপাট উচ্ছেদে সিটি করপোরেশনের ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার ও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস। অভিযান চলাকালে বেলা দেড়টার দিকে স্টেডিয়ামের সীমানা দেয়াল সংলগ্ন সেবা খোলার দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়। এ সময় সেবা খোলা মন্দিরের মূল বেদীও উপড়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা হরিকমল দাস বলেন, ‘১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মন্দির কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুদানে সংস্কার করা হয়। সরকারি অনুদানে সংস্কারের বিষয়টি মন্দিরের দেয়ালে লেখা ছিল। করপোরেশনের একজন সুপারভাইজার মোবাইল কোর্টকে বিষয়টি অবহিতও করেন। তারপরও কেন ভেঙে দেয়া হল জানি না।’

হরিকমল দাস বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, এতো কিছু তো বুঝি না। আপনারা সরকারকে বলেন যেন মন্দিরটা ঠিকমতো থাকে।’

মন্দির ভাঙার বিষয়টি ইচ্ছাকৃত নয় মন্তব্য করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার বলেন, ‘অভিযানে ফুটপাতের ওপর থাকা সব অবৈধ স্থাপনেই উচ্ছেদ করা হচ্ছিলো। সেখানে ফুটপাতের ওপর দেয়াল ছিলো। মন্দির আছে সেটা জানা ছিলো না। উচ্ছেদ চলাকালে আমাদের মেশিনের ধাক্কায় দেয়ালটি ভেঙে যায়। কোনো লোকজন সেখানে দেখিনি।’

সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলেন, ‘চালক ভুলবশত মন্দিরের দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। মেয়র মহোদয় ঘটনাস্থলে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি আগের চেয়েও আকর্ষণীয় করে মন্দিরটি গড়ে দিতে বলেছেন। সকালেই নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। দুর্গা পূজার আগেই শেষ করতে পারবো আশা করি।’

দেয়াল ভাঙার ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে শৈবাল দাশ সুমন বলেন, ‘এর জন্য তদন্ত কমিটি করা হবে। তারপর অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি চন্দন তালুকদার অভিযোগ করেন, ‘চালকের ভুল নয়, এটা ‘ইনটেনশনাল’। উচ্ছেদ অভিযান চলছিল সেবা খোলা থেকে অনেক দূরে। ওখানে কেন গেল? স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে এতে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে আমরা মেয়রকে বলেছি।’

১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোরশেদ আখতার চৌধুরী বলেন, ‘তারা ছোটবেলা থেকেই ওই মন্দির দেখে আসছেন। চালক ভেঙে ফেলেছে, ম্যাজিস্ট্রেট বলছেন, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও স্পর্শকাতর বিষয়। অভিযানের সময় আমি সেখানে ছিলাম না। খবর পেয়েই ছুটে গেছি।’

এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে মোরশেদ আখতার চৌধুরী বলেন, ‘মেয়রের নির্দেশে মেরামত শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশনই অর্থায়ন করবে।’

স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৫ সালে ওই এলাকায় মহামায়া মগ্ধেশ্বরী মায়ের সেবা খোলা স্থাপন করা হয়। পরে জহুর আহমদ স্টেডিয়াম ও কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে মন্দিরটি কিছুটা সরিয়ে নিতে হয়। সবশেষে স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্থানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মন্দিরের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে দেয়।

সনাতন ধর্মালম্বীরা বিভিন্ন ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ‘সেবা খোলায়’ গিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে তেল-সিঁদুর দিয়ে এবং মোমবাতি জ্বেলে পূজা দেন। দক্ষিণ কাট্টলীর ওই এলাকায় জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস। মূলত নিম্ন আয়ের জেলে পরিবারের সদস্যরাই ওই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে থাকেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*