বিশ্ব নদী দিবসে প্রশ্ন, পানি উন্নয়ন বোর্ড তাহলে কী করে?: আশীষ কুমার দে 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ ২৩ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। বাংলাদেশে এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন বন্ধ করো’। রিভারাইন পিপল নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের সমন্বয়ে স্বল্পপরিসরে কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও দিবসটি পালন উপলক্ষে সরকারি কোনো আয়োজন আমার দৃষ্টি বা কর্ণগোচর হয়নি। তাই রিভারাইন পিপলকে, বিশেষ করে সংস্থাটির কর্ণধার শেখ রোকনকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়; যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সীমিত পরিসরে হলেও প্রতিবছর আমরা বিশ্ব নদী দিবস পালন করছি।

আমাদের দেশের নদ-নদী-জলাভূমি রক্ষার কাজে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে নদীবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু দিবসটিতে তারা কোনো কর্মসূচি পালন করে না। অর্থাৎ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্ব নদী দিবস পালন করা হয় না। অথচ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ।

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির তরুণ শিক্ষক মার্ক অ্যাঞ্জেলো তাঁর কিছু ছাত্রছাত্রী ও বন্ধুকে নিয়ে স্থানীয় একটি নদী পরিস্কার করার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালনের শুভ সূচনা করেন। পরের বছরগুলোতে ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্য হয়ে একে একে পুরো কানাডা, নর্থ আমেরিকা, সাউথ আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ায় দিবসটি পালন হতে থাকে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করায় ওই বছর থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থাও দিবসটি পালন শুরু করে। শিক্ষক মার্ক অ্যাঞ্জেলো ততোদিনে তাঁর অকৃত্রিম নদীপ্রেমের জন্য বিশ্বব্যাপি পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশ্ব নদী দিবসে নদীপ্রেমিক মার্ক অ্যাঞ্জেলোকে জানাই রক্তিম অভিবাদন। আর বাংলাদেশে ২০১০ সালে রিভারাইন পিপল সর্বপ্রথম দিবসটি পালন করে এবং সেই থেকে পালন করে আসছে। সে জন্য এ সংক্ষিপ্ত লেখার শুরুতেই রিভারাইন পিপল ও এর কর্ণধার শেখ রোকনকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম না।

নদীর সঙ্গে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, কৃষিতে সেচ সুবিধা প্রদান, মাছসহ বিভিন্ন ধরনের জলজসম্পদ আহরণের সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নৌ পরিবহন ব্যবস্থার সম্পর্কও। আমাদের নৌ পরিবহন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে নৌপথকে সম্প্রসারিত করতে হবে। এজন্য নদ-নদীগুলোকে রক্ষা করা অপরিহার্য। কারণ নদী না থাকলে নৌপথ থাকবে না। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে নদ-নদী রক্ষা, বিলুপ্ত নদী ও নৌপথ পুনরুদ্ধার এবং অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলেছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেন। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দও দিতে থাকে সরকার; যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু নদী রক্ষা ও পুনরুদ্ধার খাতে গত প্রায় ১০ বছরে যে আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি, সে কথা পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে।

১৯৬৫-৬৭ পর্যন্ত পরিচালিত নেদারল্যান্ডের বিশেষজ্ঞদের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নৌপথের সংখ্যা ৩০০ এবং আয়তন ২৫,১৪০ কিলোমিটার। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এই তথ্য প্রকাশ করে। এরপর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নানা কারণে নৌপথের সংখ্যা ৫০-এর নিচে নেমে আসে। দৈর্ঘ্য কমতে কমতে ৫,৯৬৮ কিলোমিটারে এসে দাঁড়ায়। তবে এটা শুধুমাত্র বর্ষা মৌসুমে; শুকনো মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য নেমে আসে ৩,৮০০ কিলোমিটারে। বিআইডব্লিউটিএর ওয়েবসাইটে সর্বশেষ প্রকাশিত এক তথ্যে বলা হয়েছে, “দেশের নৌ সেক্টরে সরকার বিশেষ গুরুত্ব ও দৃষ্টি দেয়ায় এবং কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফলে শুস্ক মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য ৩,৮০০ কি.মি. হতে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪,৩৪৭ কি.মি. হয়েছে অর্থাৎ ৫৪৭ কি.মি. বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে ৬,০০০ কি.মি. অপরিবর্তিত রয়েছে।” এই তথ্য মতে, গত প্রায় ১০ বছরে নতুন নৌপথ উদ্ধারে আমাদের অর্জন মাত্র ৫৪৭ কি.মি.।

তবে ‘বর্ষা মৌসুমে ৬,০০০ কি.মি. নৌপথ অপরিবর্তিত রয়েছে’ বলে বিআইডব্লিউটিএর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ নৌপথের গভীরতাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে বর্ষা মৌসুমে প্রথম শ্রেণির ৬৩৮ কিমি, দ্বিতীয় শ্রেণির ১,০০০ কিমি, তৃতীয় শ্রেণির ১,৮৮৫ কিমি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২,৪০০ কিমি নৌপথ রয়েছে। সূত্র: River, Canal and Pond dedging/re-excavation in Bangladesh [Concept Paper 2016 (draft)]. প্রসঙ্গত, কনসেপ্ট পেপার তৈরির সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলীরাও জড়িত ছিলেন।

আমার প্রশ্ন এখানে নয়। বিলুপ্ত নদ-নদী উদ্ধার, বৃহৎ নদীগুলো খনন, নদীভাঙন ও নদীতীর বা তীরবর্তী এলাকায় বাঁধ নির্মাণ কাজের সঙ্গে সচল বা পরিত্যক্ত নৌপথ খনন ও নিয়মিত ড্রেজিং (পলি অপসারণ) কাজের বেশ তফাৎ রয়েছে। প্রথম কাজটি করার দায়িত্ব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর অর্পিত। দ্বিতীয় কাজটির দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর ওপর। অর্থবরাদ্দ থেকে শুরু করে আধুনিক ড্রেজার, জনবল ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক সুবিধার দিক থেকে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত প্রায় এক দশকে পাউবোর বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তারা বিলুপ্ত কিংবা বিপন্ন অথবা শুকিয়ে যাওয়া কোনো নদী উদ্ধার ও খননের মাধ্যমে খরস্রোতা ও নৌযান চলাচলের উপযোগী করে তুলতে পেরেছে- এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন কবলিত এলাকা রক্ষার নামে নদীতে ‘জিও ব্যাগ’ ফেলানো, নদীতীর পাইলিং ও স্লুইসগেট নির্মাণের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজেই পাউবোর ব্যস্ততা বেশি পরিলক্ষিত হয়।

অন্যদিকে প্রয়োজনের চেয়ে কম জনবল এবং তুলনামূলক ছোট (কম ক্ষমতাসম্পন্ন) ড্রেজার দিয়ে নৌপথ খনন ও নিয়মিত পলি অপসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। দেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়াসহ সারা দেশের সচল নৌপথগুলোর নাব্য রক্ষার জন্য নিয়মিত পলি অপসারণ এবং পরিত্যক্ত নৌপথগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য সেসব নদী খননে সংস্থাটি সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও ৫৪৭ কি.মি. নৌপথ খনন করে নাব্য ফিরিয়ে এনে শুকনো মৌসুমে নৌযান চলাচলের উপযোগী করেছে সংস্থাটি। যদিও এই সামান্য অর্জনে আমরা খুশি নই, তবুও বলবো, পাউবোর চেয়ে এ সংস্থা অনেক বেশি জনবান্ধব।

আমাদের বিশ্বাস, পাউবো যদি নদী খননে বিআইডব্লিউটিএ-কে সহায়তা করতো, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতো, তাহলে গত ১০ বছরে অন্তত ৫,০০০ কিমি নৌপথ উদ্ধার তথা নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নৌযান চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হতো। তারা সে কাজটি কখনও করেনি, করতে চায়ও না। তাই প্রশ্ন জাগে- পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজটা কী?

বিশ্ব নদী দিবস নিয়ে এ সংক্ষিপ্ত লেখার উপসংহারে বলতে চাই, বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে, আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে নদ-নদীসহ প্রাকৃতিক পানিসম্পদ রক্ষা করতে হবে। তবে বিলুপ্ত নদ-নদী উদ্ধার ও বহমান নদীগুলো সুরক্ষা করতে হলে নদীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার না হলে তা যেমন ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়, তেমনি নদীর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত না হলে একই দশা হবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করতে হবে।
আশীষ কুমার দে: প্রধান সম্পাদক, পিটিবিনিউজবিডি.কম। সাধারণ সম্পাদক: নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.