কড়া নিরাপত্তায় রাজধানীতে তাজিয়া মিছিল শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
হিজরির সাল অনুসারে ১০ মহরম তথা আশুরা মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের দিন। ঘটনাবহুল এই দিনে বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত কারবালা প্রান্তরে মুয়াবিয়ার হাতে শহীদ হন হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন। এদিন সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে আশুরা। আজ শুক্রবার সকালে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিল পুরান ঢাকার হোসনি দালান থেকে শুরু হয়েছে। এটি যাবে ধানমন্ডি লেক পর্যন্ত। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা সাদা ও কালো পোশাক পরে হাতে নানা ধরনের পতাকা নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছেন। এদিকে, এই মিছিল উপলক্ষে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ইমামবাড়া থেকে ধানমন্ডি লেক পর্যন্ত পাহারা দিচ্ছেন। মিছিলের সঙ্গেও নিরাপত্তা দিচ্ছেন তারা।

তাজিয়া মিছিল সাজানো হয়েছে কারবালার শোকের নানা প্রতিকৃতি দিয়ে। বিবি ফাতেমার স্মরণে মিছিলের শুরুতেই দুইটি কালো গম্বুজ বহন করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা বহন করছেন বিভিন্ন নিশান। মিছিলে দুইটি ঘোড়া রয়েছে যার মধ্যে একটিকে রং দিয়ে রক্তের রূপ দেয়া হয়েছে। ইমাম হোসেন যখন কারবালায় যান তখন এক রকম থাকে, আবার যুদ্ধের শেষে রক্তাক্ত ঘোড়ার অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।

তাজিয়া তৈরি করা হয়েছে ইমাম হোসেনের সমাধির আদলে। একদল রয়েছেন যারা শোকের গান গাইতে গাইতে সামনের দিকে এগুচ্ছেন। এছাড়া অনেকেই বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করছেন। গায়ে রঙ লাগিয়ে কারাবালার সেই রক্তপাতের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে মিছিলে।

কারবালার রক্তাক্ত স্মৃতির স্মরণে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত নিজের দেহে ছুরি দিয়ে আঘাত করে রক্ত ঝরিয়ে মাতম করেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের অনুরোধে এবার ছুরি দিয়ে মাতম করা হচ্ছে না। হোসেনী দালান ইমামবাড়ি থেকে তাজিয়া মিছিলটি শুরু হয়ে বকশীবাজার রোড, নিউমার্কেট হয়ে ধানমন্ডি লেকের ‘কারবালা’ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে যোগ দিয়েছেন। মূল তাজিয়া মিছিলে যোগ দিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কালো কাপড় পড়ে হোসেনী দালানে আসতে থাকেন। নিরাপত্তা বিবেচনায় মিছিলে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রত্যেককে পুলিশের তল্লাশি চৌকির মধ্য দিয়ে যেতে দেখা গেছে।

হোসাইনী দালান ইমামবাড়ার সুপারিনটেনডেন্ট এম এম ফিরোজ হোসাইন বলেন, বরাবরের মতো আয়োজন করা তাজিয়া মিছিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছি। এছাড়া প্রায় ৩০০ জন ভলান্টিয়ার মিছিলের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য নিয়োজিত রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বকশীবাজার মোড়ে পুলিশ মোতায়েন আছে। নিরাপত্তার জন্য জলকামান, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নির্বাপক গাড়ি, সাজোয়া যানসহ বিভিন্ন গাড়ি রয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর লালবাগের হোসনি দালান ইমামবাড়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, আসন্ন পবিত্র আশুরায় জঙ্গি হামলার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি বিবেচনায় নিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ। তিনি বলেন, তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে হোসনি দালান থেকে ধানমন্ডি লেক পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাক, গোয়েন্দা পুলিশ, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ও ডগ স্কোয়াড নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। এছাড়া কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াত টিম প্রস্তুত থাকবে।

তাজিয়া মিছিলে ঢোল বাজিয়ে দা, ছুরি, তলোয়ার ও লাঠিখেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১২ ফুটের বেশি বড় নিশান মিছিলে ব্যবহার করা যাবে না। আগুনের ব্যবহার করা যাবে না। মিছিলে ব্যাগ, পোঁটলা, টিফিন ক্যারিয়ার বহন করা যাবে না। অংশগ্রহণকারীদের মিছিলে ঢোকার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। মাঝপথে কেউ মিছিলে অংশ নিতে পারবেন না। বিবিকা রওজাসহ রাজধানীতে মিছিল যাওয়ার প্রতিটি পথে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। মিছিলের ও হোসনি দালানের স্বেচ্ছাসেবীদের শনাক্ত করতে আলাদা আর্ম ব্যাজ ব্যবহার করতে হবে।

কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হয় মুসলিম বিশ্বে। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.