ঘূর্ণিঝড় মাংখুটের তাণ্ডবে ফিলিপিন্সে ২৫ জনের প্রাণহানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম
ফিলিপিন্সের উত্তরাঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় (টাইফুন) মাংখুটে এ পর্যন্ত অন্তত অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ফিলিপিন্সের প্রধান দ্বীপ লুজনের কর্দিলিয়ারা অঞ্চলে ২০ জন, নুয়েভো ভিজকাইয়া প্রদেশের আশপাশে চারজন ও অপরজন ইলোকস সুর প্রদেশে। তবে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে খবরে বলা হচ্ছে। স্থানীয় সময় আজ রোববার টেলিফোনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ফ্রান্সিস তোলেন্তিনো।

প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুর্তার্তের এ রাজনৈতিক উপদেষ্টা জানান, কর্দিলিয়ারা ও নুয়েভো ভিজকাইয়ায় নিহতদের অধিকাংশই ভূমিধসের শিকার হয়েছেন। অপরদিকে ইলোকস সুর প্রদেশে নিহত ব্যক্তি উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়েছিলেন। নিহতের এ সংখ্যায় স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয়েছে।

তোলেন্তিনো প্রধান দুর্যোগ মোকাবিলা সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। তিনি আরো জানিয়েছেন, মাংখুটে লুজনের উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে আসা অব্যাহত আছে।

কর্দিলিয়ারা থেকে আসা নিহতের সংখ্যাটি সমর্থন করেছেন বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের এমানুয়েল সালামাত। পুলিশ প্রতিবেদনেও সেখানে ২০ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

টাইফুন মাংখুট ফিলিপিন্সের প্রধান দ্বীপ লুজনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমমুখে চীনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

ফিলিপিন্সের সরকারি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টাইফুনটির তাণ্ডবে তুগেগ্যারাও শহরের প্রায় সব ভবন কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

টাইফুনটি ঘন্টায় ১৮৫ কিলোমিটার বাতাসের বেগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এর গমনপথে ৪০ লাখ লোকের বসবাস। টাইফুনের কারণে ছয় মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাসে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার লোককে তাদের ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রবল ঝড়ে উপকূলীয় শহর আপারির আশ্রয় কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শহরটির ফোন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ফিলিপিন্সের স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর প্রায় ১টা ৪০ মিনিটের দিকে কাগায়ন প্রদেশের বাগগাও এলাকা দিয়ে টাইফুনটি স্থলে উঠে আসে। এরপরও বাগগাওতে কেউ নিহত হননি বলে জানিয়েছেন ফিলিপিন্সের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান রিকার্দো জালাদ।

স্থলে উঠে আসার পর টাইফুনটির বাতাসের বেগ কিছুটা হ্রাস পায়। এতে কিছুটা দুর্বল হয়ে সুপার টাইফুনের অবস্থা থেকে এটি প্রায় চার মাত্রার সমতুল্য একটি হারিকেনে পরিণত হয়। স্থানীয়ভাবে ওমপোং নামে পরিচিতি টাইফুনটির মেঘের বহর প্রায় ৯০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং এটি ঘন্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিমমুখে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই টাইফুনটিকে চলতি বছর এ পর্যন্ত আঘাত হানা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে ঘোষণা করেছে।

দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রধান রিকার্দো জালাদ জানিয়েছেন, আক্রান্ত এলাকাগুলো থেকে এ পর্যন্ত ৪১টি ভূমিধসের খবর এসেছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

প্রতিরক্ষা সচিব দেলফিন লোরেনজানা বলেন, শনিবার ভোরে কাগায়ান রাজ্যের ব্যাগাও শহরে ভূমিধসের ফলে তিনটি বিদ্যুৎ স্থাপনা (টাওয়ার) মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কাগায়ানের বিধ্বস্ত তুগুয়েগারাও বিমানবন্দরটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং সেখানে এরই মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, কাগায়ানসহ কয়েকটি রাজ্যের হাজার হাজার ঘরবাড়ির চাল উড়ে গেছে এবং বিপুল পরিমাণ এলাকার ধান ও ভুট্টার ক্ষেত মাটিতে শুয়ে পড়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, এই ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথে ফিলিপাইনের প্রায় ৪২ লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। ৯০ হাজার মানুষকে অতি বিপজ্জনক জায়গা থেকে সরিয়ে নিরাপদে নেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতিস্বরূপ কাগায়ানের স্কুল-কলেজ ও অফিস-আদালত বৃহস্পতিবার থেকেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

রোববার বিকালে মাংখুট হংকংয়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাবে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার টাইফুনটি দুর্বল হয়ে একটি ক্রান্তীয় নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে পূর্বাভাসে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে।

এই ঘূর্ণিঝড়ে আঘাতকে সামনে রেখে হংকংয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা জরি করা হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার গতিতে হংকংয়ের দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে আঘাত করার কথা রয়েছে। হংকংয়ে আঘাত করতে যাওয়া টাইফুন মাংখুত ছয় দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। তবে শহরটি এরইমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। দোকানপাট বন্ধ, সব ধরনের ভ্রমণ স্থগিত করাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।

হংকং অবজারভেটরি জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি এখন প্রতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে চীনের গুয়াংডংয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের দিকে এগোচ্ছে।

ম্যাংখট দুর্যোগপ্রবণ দেশটিতে আঘাত হানা এ বছরের ১৫তম ঘূর্ণিঝড়। দেশটিতে সাধারণত বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টি ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে।এই ঘূর্ণিঝড় ২০১৩ সালে আঘাত হানা ফিলিপিন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সুপার ঘূর্ণিঝড় হাইয়ানের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে। হাইয়ানের আঘাতে সাত হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছিলো। তবে ওই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকে ফিলিপিন্সের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি ও লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া উন্নত হওয়ায় মাংখুটে হতাহতের সংখ্যা কম হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.