মানবতার হাত বাড়াই, নড়িয়াবাসীকে বাঁচাই: আশীষ কুমার দে

আশীষ কুমার দে

পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে গত দুই মাসে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার অন্তত দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা চলে গেছে নদীগর্ভে। মুক্তারের চর, কেদারপুর ইউনিয়ন ও নড়িয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড এখন অস্তিত্বহীন প্রায়। নড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সনজিদা ইয়াসমিনের তথ্য মতে, ভাঙনের কারণে এসব এলাকার পাঁচ হাজারের মতো পরিবার বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে। সূত্র: বিডিনিউজ।

২৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত নড়িয়া উপজেলার মানুষ একসময় কৃষির ওপর নির্ভর করলেও এখন এ এলাকার আয়ের একটি বড় উৎস প্রবাসী আয়। অনেক পরিবারেই কেউ না কেউ ইটালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন থাকেন। তাদের পাঠানো টাকায় সুদৃশ্য তিন-চার তলা বাড়িও তুলেছিলেন অনেকে। কিন্তু পদ্মা কেড়ে নিচ্ছে সব।

গত এক সপ্তাহে সাধুর বাজার, ওয়াপদা বাজার, মুলফৎ বাজার, চর জুজির গাঁও, দাসপাড়া, উত্তর কেদারপুর এলাকার বহু ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, কালভার্ট আর চার শতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চোখের সামনে চলে গেছে পদ্মার পেটে। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিচ্ছেন।

সর্বস্বহারা পরিবারগুলোর আশ্রয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে ৩৯টি সাইক্লোন সেন্টারে। খাদ্য সহায়তা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে চাল ও শুকনা খাবার। পাশাপাশি পুনর্বাসনের জন্য টিন আর টাকা দেয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পদ্মা তীরের কৃষিজমি ভাঙতে ভাঙতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে এগোতে থাকায় কয়েক বছর ধরেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। সরকারের তরফ থেকে গত জানুয়ারিতে হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজ শুরুর আগেই জুলাই মাসে পদ্মায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।

শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে এক লাখ ১০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে নদীতে। তাতে নদী তীরে স্রোতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ভাঙন থামেনি। আর বর্ষার পানি না কমা পর্যন্ত তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজও করা সম্ভব নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ভাঙনকবলিত নড়িয়া ও এখানকার সর্বস্তরের মানুষের এই চরম দুর্দশার জন্য কী শুধু প্রকৃতি তথা পদ্মার আগ্রাসী চরিত্রই দায়ী, না-কি এটি মনুস্যসৃষ্ট বিপর্যয়?

সরকারের নীতিনির্ধারকরা তো ভাঙন ঠেকাতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছেন। সে ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার তো কোনো ঘাটতি ছিল না। গত কয়েক বছর ধরেই তো পদ্মার এই এলাকা ভাঙছে। তাহলে পানি উন্নয়ন বোর্ড, শরিয়ত জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সময় থাকতে কেনো জোর তৎপরতা শুরু করলেন না। না-কি, অর্থ লোপাটের উদ্দেশে জরুরি ভিত্তিতে এক লাখ ১০ হাজার জিও ব্যাগ নদীতে ফেলার জন্য ভয়াবহ ভাঙন শুরুর অপেক্ষা করছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা?

কারণ আদৌ এক লাখ জিও ব্যাগ নদীতে ফেলা হবে, না-কি ৫০ হাজার ব্যাগ ফেলেই এক লাখ ১০ হাজার দেখানো হবে- তার হিসাব কোনোদিনও মিলবে না। তাহলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কী এ দায় এড়াতে পারে? স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও কী দায়দায়িত্বের উর্ধ্বে?

অন্যদিকে, আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে- প্রমত্ত পদ্মার আগ্রাসনই এই ভয়াবহ ভাঙনের জন্য দায়ী? নদীর বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে আপন স্রোতধারায় প্রবাহিত হওয়া। কিন্তু আমরা কি নদীগুলোকে অক্ষত রেখে সেভাবে প্রবাহিত হতে দিচ্ছি? দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করে প্রতিনিয়ত নদ-নদীগুলোকে ক্ষত-বিক্ষত করছি। তাইতো প্রাকৃতিক নিয়মেই নদী তার গতিপথ খুঁজে নিচ্ছে, প্রাকৃতিক ক্ষমতা বলে নিজ আয়তন ধরে রাখতে ধ্বংসলীলা শুরু করেছে, বিভিন্ন জনপদ গ্রাস করছে। পদ্মার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

এখন সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয় হচ্ছে- নড়িয়াকে বাঁচাতে হবে। তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো ভাঙনবিধ্বস্ত নড়িয়ার সর্বহারা মানুষগুলোকে বাঁচানো।
আসুন, আমরা মানবতার হাত প্রসারিত করি। সহায়-সম্বলহীন নড়িয়াবাসীর পাশে দাঁড়াই। প্রসারিত করি মানবতার হাত। তাদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও সর্বোচ্চ সহানুভুতি রয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ সাধারণ জনগণের জন্য তিনি অত্যন্ত মমতাময়ী একজন মানুষ।
আশীষ কুমার দে: প্রধান সম্পাদক, পিটিবিনিউজবিডি.কম

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*