বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে কমিশন: প্রধানমন্ত্রী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে সরকার একটি কমিশন গঠনের বিষয় সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বুধবার (১২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সাংসদ মোহাম্মাদ আবদুল্লাহর (লক্ষ্মীপুর-৪) এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এর আগে বিকাল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ পরপর দুই বার সরকার গঠনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পূর্বে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এতে দেখা যায়, পরোক্ষভাবে দেশি ও বিদেশি কিছু লোক ও সংস্থা বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। এজন্য জাতির পিতা হত্যার পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে একটি কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর যেসব খুনি বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে এবং আশ্রয় গ্রহণ করেছে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সব প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, কানাডায় বসবাসরত পলাতক আসামি নূর চৌধুরীর তথ্য দিতে ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিসের আদালতে আবেদন করা হয়েছে। পলাতক রাশেদ চৌধুরীকে আমেরিকা থেকে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

এতো আন্দোলনের পরও রাস্তা পারাপারে সচেতনতা বাড়েনি
সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে পথচারীদের সচেতনতা আরো বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতো বড় আন্দোলনের পর রাস্তা পারাপারে পথচারীদের সচেতনতা বাড়েনি। এখনো যত্রতত্র রাস্তা পার হতে দেখা যায়।

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন সম্পর্কিত সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ নূর ই হাসনা লিলি চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো রাস্তা পারাপারে দেখা যায়— অনবরত গাড়ি চলাচলের মধ্যেই একটা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে মা রাস্তা পার হচ্ছেন অথবা বাবা বাচ্চাদের নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। অথচ খুব কাছেই ফুটওভার বা আন্ডারপাস তারা ব্যবহার করছেন না। এমনকি যুবকরাও এসব ব্যবহার না করে দৌড়ে রাস্তা পার হতে চাচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। রাস্তা পারাপারে পথচারীদের দোষ কতটুকু— সেটাও দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দুর্ঘটনার পর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যেকোনো দুর্ঘটনার পরে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টার তুলনায় চালককে ধরে মারার আগ্রহটাই সবাই বেশি দেখায়। যে কারণে দুর্ঘটনার পরে চালকরা আহত ব্যক্তিকে চাপা দিয়ে হলেও পালানোর চেষ্টা করে। ফলে যার বাঁচার সম্ভাবনা থাকে তিনিও আর বাঁচার সুযোগ পান না। তিনি বলেন, মারধর যদি বন্ধ হয় তাহলে অনেক দুর্ঘটনা কমে যায়। এটা হলো বাস্তবতা। রাস্তা পারাপারের সময় সবার অন্তত ট্রাফিক আইন মেনে চলা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চালকদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, কিন্তু এসব পথচারীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে? তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই এটা থামবে। ট্রাফিক নিয়মটা স্কুল থেকে সবাইকে শেখানো উচিত।

এর আগে তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সংক্রান্ত ৯ দফা দাবির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন কার্যক্রম গ্রহণসহ নানা উদ্যোগের কথা জানান।

সাংসদ একেএম রহমতুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা শহরে এলিভেটেড রিংরোড করার পরিকল্পনার কথা জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগে নৌপথ ও এর পাড় ধরে ভবিষ্যতে রিংরোড করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।

সব দেশের রাজধানীতেই যানজটের সমস্যা রয়েছে
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার লন্ডনে বসবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, পৃথিবীর বড় বড় শহরেও যানজটের সমস্যা রয়েছে। সব দেশের রাজধানীতেই যানজটের সমস্যা রয়েছে। ‘৬৯ সালে যখন লন্ডনে ছিলাম তখনো এই যানজটের সমস্যা। আশিতে যখন ছিলাম তখনো এই সমস্যা। এখনো গেলে সমস্যা।’

ঢাকার যানজট সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি যত হচ্ছে তারা তত বেশি গাড়ি ব্যবহার করছে। আর যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আগে যে পরিবারের একটিও গাড়ি ছিলো না, এখন তাদের মধ্যে কোনো কোনো পরিবার দুটিও গাড়ি চালাচ্ছে। যার একটি গাড়ি ছিলো তার এখন তিনটি গাড়ি। নিজে চালানোর পরিবর্তে চালকদের দিয়ে গাড়ি চালনোর প্রবণতার ফলে গাড়ি রাস্তায় অনবরত ঘুরতে থাকে। আর যানজট লেগেই থাকে। যানজট যেমন সমস্যা, তেমনি যানজটে কিন্তু এটাও বোঝায় যে— বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত হচ্ছে। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে এবং তারা গাড়ি ব্যবহার করতে পারছে। ঢাকায় এটাকে নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিবে
সরকারি দলের সদস্য মো. মনিরুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের অর্পিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে সরকার প্রত্যাশা করে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় দেশের জনগণ সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। সুষ্ঠুভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুসারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য জনবলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কমিশনের চাহিদা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনাক্রমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। তিনি বলেন, সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজন নির্বাচন কমিশনারের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন।

দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য
সরকারি দলের সদস্য মমতাজ বেগমের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উদার গণতান্ত্রিক এবং ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ এবং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত এবং গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করবে, যেখানে গণমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ২০১৫ সালেই স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে এসেছে। এতেই প্রতীয়মান হয় যে, দেশ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

আগামী ৩ বছরের মধ্যেই দেশ থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কেমন হবে সে জন্যই দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এখনই শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আগামী ২৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা এবং ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ, উন্নত-সমৃদ্ধ, সুখী একটি দেশ।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারিত করেছে এবং অন্যান্য বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে ৭.৪ ভাগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে যা ২০২০ সাল নাগাদ আট ভাগে উন্নীত হবে এবং দারিদ্রের হার বর্তমান ২২ শতাংশ থেকে ১৮.৬ শতাংশে নেমে আসবে।

ডেল্টা প্লান-২১০০ বাস্তবায়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষি, মৎস্য, শিল্প কারখানা, বন, পানি ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.