৭ মার্চের ভাষণ শুনে আমিও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গিয়েছিলাম: উপেন তরফদার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

এখনও কোনো নির্জন দুপুরে কিংবা গভীর রাতে যখন একলা থাকি, তখন কানে বাজে সেই কণ্ঠস্বর- ‘মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশালল্গাহ! এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ বলার অপেক্ষা রাখে না এই কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর কানে বাজে অংশুমান রায়ের সেই গান- ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি- প্রতিধ্বনি, আকাশ বাতাসে ওঠে রণি, বাংলাদেশ- আমার বাংলাদেশ।’

আমি ১৯৫৪ সালে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগে যোগ দিই। আর ১৯৯৪ সালে কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্র থেকে অবসর নিই। আমার ৪০ বছরের কর্মজীবনের মধ্যে ২৫ বছরেরও বেশি সময় ‘সংবাদ বিচিত্রা’ প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলাম। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল আকাশবাণী কলকাতা, সংবাদ বিচিত্রা। আমার কর্মজীবনে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় বলে আমি মনে করি। নির্যাতিত, নিপীড়িত বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা একদিন আবিস্কার করলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের বিরুদ্ধে ওপার বাংলার সংগ্রামী ভাইবোনদের সঙ্গে আমরাও এক একজন সৈনিক হয়ে লড়াই করছি।

যে প্রসঙ্গ দিয়ে লেখা শুরু করেছি- ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা পাকিস্তান বেতার প্রথমে সম্প্রচার করেনি। কেন জানি না পরে ভাষণটি ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়। আমরাও সেই রেকর্ড সংগ্রহ করে রাখি। সেদিন সংবাদ বিচিত্রার জন্য অংশুমান রায়ের গান আর বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পী কামরুল হাসানের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে এনেছিলাম। আমার বন্ধু সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে এসেছিলেন কামরুল হাসান। দেবদুলালের ফোন পেয়ে ছুটলাম টেপরেকর্ডার নিয়ে, কেননা তখন বাংলাদেশের ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন ওরাই।

স্টুডিওতে ফিরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ক্যাসেট হাতে পেলাম। ক্যাসেট চালানোর পর শুধু আমি নই, স্টুডিওতে হাজির সবার চোখে জল, পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে একটি উত্তেজনা অনুভব করলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম আজকের সংবাদ বিচিত্রায় কোনো ভাষ্য থাকবে না। শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর অংশুমানের সেই গান- ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের’…। এই দুইয়ের মিশেলে সেদিনের সংবাদ বিচিত্রা সম্প্রচারের পর দারুণ সাড়া পড়ে গিয়েছিল। পরে অংশুমান রায়ের ওই গানটি রেকর্ড করে বাজারে ছাড়া হয়েছিল এবং সেখানেও গানটি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়ে শুরু হয়েছিল। এই গানটির ইংরেজি অনুবাদও অংশুমান রেকর্ড করেছিল।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কত স্মৃতি- মনে পড়ছে আমি, দেবদুলাল, প্রণবেশ সেন; আমাদের এই তিনজনের একটি টিম তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে রণাঙ্গনের নিত্যনতুন খবর দিয়ে সাজানো হতো সংবাদ বিচিত্রা। আমাদের সামনে-পিছনে এগিয়ে চলেছে ভারতীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ান। টেপরেকর্ডার চালিয়ে আরও কিছু বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে চলেছি রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে। শত্রুপক্ষ রাস্তার দু’ধারে মাইন পুঁতে রেখেছে। তা ছাড়া শত্রুপক্ষের ‘শেল’ যে কোনো মুহূর্তে আছড়ে পড়তে পারে। তারই মধ্যে ‘স্পট কমেন্ট্রি’ করে রণাঙ্গনের বাস্তব ছবিটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সহকর্মী বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকারও নিতাম। রাতে ফিরে এসব খণ্ডচিত্র জোড়া দিয়ে তৈরি হতো ‘সংবাদ বিচিত্রা’।

মনে পড়ছে জেনারেল শ্যাম মানেকশর কণ্ঠে ঘোষিত সেদিনের নির্দেশ- ‘আমাদের সেনারা চারিদিক থেকে তোমাদের ঘিরে ফেলেছে। তোমাদের আর পালাবার পথ নেই। অবিলম্বে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করো, নতুবা চরম পরিস্থিতির জন্য তৈরি হও।’ অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত- পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজিসহ ৭১ হাজার পাকিস্তানি সেনা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করল। মুক্ত হলো বাংলাদেশ।

ভারতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করলেন, ‘আমি একটি ঘোষণা করতে চাই। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছে। ঢাকা এখন একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী।’

মনে পড়ছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আগে দিল্লিতে এসে জনসভায় উদাত্ত ভাষণ দিয়েছিলেন- ‘আমি বিশ্বাস করি সেক্যুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি জনগণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি সোশ্যালিজমে, আমাকে প্রশ্ন করা হয় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আপনার এত মিল কেন? আমি বলি- এটা আর্দশের মিল, এটা নীতির মিল, এটা বিশ্বশান্তির মিল। আমি আজ কিছুটা ইমোশনাল, আপনারা বুঝতে পারেন, আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। আবার আপনাদের ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিচ্ছি। জয় বাংলা। জয়হিন্দ- জয় ইন্দিরা গান্ধী।’

আজ অনেকগুলো বছর পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও কিছু স্মৃতি আমাকে ভাবায়। সেদিন যখন খবরটা পেলাম- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন, তখন কোনো বোধ কাজ করছিল না। এত বছর পরেও সেই স্মৃতি মনে পড়লে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। রাগে ফুঁসে ওঠা নিয়তির কী পরিহাস! স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার নিহত হলেন নিজের দেশের সেনাদের হাতে। অথচ তিনি যখন কারাগারে ফাঁসির দিন গুনছেন, তখন বিশ্বের প্রবল জনমতের চাপে তাকে মুক্তি দিতে হয়েছিল। মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর দিল্লির সেই জনসভার বক্তৃতা- ‘আমি ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম যে, আমার বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।… আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম- তোমরা যদি আমায় মেরে ফেলো আমার আপত্তি নাই। মৃত্যুর পর আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিও- এই একটা অনুরোধ করেছিলাম।’

মনে পড়ে আয়েশা নামের ছোট্ট মেয়েকে। ওর চোখের সামনে ওর পরিবারের সবাই খুন হয়েছিল। কীভাবে পালিয়ে এসে ঠাঁই পেয়েছিল কলকাতার বাংলাদেশ মিশনে। সে কি ফিরতে পেরেছিল স্বাধীন বাংলাদেশে? আর সেই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যে সংবাদ বিচিত্রার একটি বিশেষ পর্ব শোনার জন্য আমার সঙ্গে দেখা করেছিল। সেদিন ব্যস্ততার জন্য শোনাতে পারিনি… এরপর অনেক দিন কেটে গেলেও সেই তরুণটি আর আসেনি। কী হয়েছে তার কে জানে? স্মৃতির এইসব কোলাজ নিয়ে দিন কেটে যাচ্ছে, যা কখনও কখনও চোখের কোল ভিজিয়ে দেয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*