প্রেমের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় ইবির দুই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মুনতা হেনা ও রোকনুজ্জামান।

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
হায়রে প্রেম! এ প্রেম নিয়ে কতোই না গল্প, নাটক, সিনেমা তৈরি হয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রেমের কারণে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন নজির। তবু সবার জীবনে প্রেম সুখ বয়ে আনে না। এছাড়া কারো করো জীবনে হতাশাও বয়ে আনে। আর এ হতাশা থেকে প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট সবাই মেনে নিতে পারে না। তাই অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা নিজের জীবন বলি দিয়ে তার কাছের মানুষকে বুঝিয়ে দেয় কতই না তাকে সে ভালোবাসতো। তেমনটাই হয় তো করেছেন রোকনুজ্জামান ও মুনতা হেনা। তারা কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছিলেন। মেধাবী দুই শিক্ষার্থী ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু পরিবার প্রেমের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী পৃথকস্থানে আত্মহত্যা করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ও রাতে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক স্থান থেকে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন গলায় ফাঁস দিয়ে এবং অপরজন ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে তাদের বন্ধুরা জানান।

পুলিশ, পরিবার ও বন্ধুর সূত্রগুলো বলছে, প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে পারিবারিক দ্বন্দ্বে তাঁরা আত্মহত্যা করেছেন। দুজনের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নিহতদের সহপাঠিরা জানান, রোকনুজ্জামান ও মুমতাহিনার মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। কিছুদিন ধরে মুনতা হেনার পরিবার তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলো। মুনতা হেনা তাদের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি পরিবারকে জানালে তারা মেনে নিতে রাজি হয়নি। এরপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঝিনাইদহ শহরের ঝিনুক টাওয়ারের পঞ্চম তলার একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন মুনতা হেনা। প্রেমিকার আত্মহত্যার খবর শুনে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রেমিক রোকনুজ্জামান কুষ্টিয়া শহরের মতি মিয়া রেল গেটে ট্রেনের নিচে লাফ দেন। রোকনুজ্জামান প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। মুনতা হেনাও স্নাতকে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুনতা হেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফুল আলমের মেয়ে। রোকনুজ্জামানের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলায়। তিনি কুষ্টিয়া শহরের পিয়ারাতলার একটি ছাত্রাবাসে থাকতেন।

ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ এমদাদুল হক বলেন, মেয়েটির আত্মহত্যার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া পোড়াদহ জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আজিজ বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলার এক যুবক পোড়াদাহ থেকে ছেড়ে যাওয়া গোয়ালন্দগামী শাটল ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহ উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার রাতেই ওই দুই শিক্ষার্থীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান জানান, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুনতা হেনা ও রোকনুজ্জামান। দুজনই বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। স্নাতক পর্যায়ে রোকন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। মুনতা হেনার ফল ছিলো সিজিপিএ (কিউমিলিটিভ গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ) ৩.৫০। তিনি বলেন, তাঁরা কেনো যে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, অবাক লাগছে। দুজনের মরদেহ বৃহস্পতিবার রাতেই ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে দেয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে রোকনুজ্জামানের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেন, আমরা হতভম্ব হয়ে গেছি—রোকন এমন একটা কাজ করেছে! এটা মানতেই পারছি না। রোকন খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলো। মুনতা হেনার সঙ্গে রোকনের কয়েক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো।’

আজ শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর জানিয়ে বলেছে, ‘জীবনে চলার পথে ঘাত-প্রতিঘাত এবং যেকোনো সমস্যা আসতেই পারে। কিন্তু আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এ ধরনের অকাল মৃত্যু কারও কাম্য নয়।

এই দুই শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনও শোক প্রকাশ করেছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*