আদিবাসীরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়: সন্তু লারমা

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, ‘আদিবাসী মানুষ দেশান্তরী হতে চায় না। এই বাংলাদেশ তাদের মাতৃভূমি। এ দেশের আর সব মানুষের মতো মর্যাদা নিয়ে, সম্মান নিয়ে তারা বেঁচে থাকতে চায়।’

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা এ কথা বলেন।

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এসব জাতিসত্তার মানুষ প্রান্তিক অবস্থায় আছেন। বাংলাদেশের নানা সরকারি দলিলেও তাঁদের প্রান্তিক অবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে। আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সুযোগ এখনো এসব মানুষ পাননি।

এসব জাতির মানুষেরা বলছেন, এই অবস্থার ফলে তাঁদের ওপর নিগ্রহ বাড়ছে। এতে তাঁদের ভূমি ও আবাসস্থল দখল হচ্ছে। তাঁরা দেশান্তরী হচ্ছেন। এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়—‘আদিবাসী জাতিসমূহের দেশান্তর: প্রতিরোধের সংগ্রাম’।

সন্তু লারমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অনেক জায়গায় জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভূমি ও সম্পদ দখল হচ্ছে। তাদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। শাসকগোষ্ঠীর দর্শন ও চিন্তাধারা গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক নয়। আর এ জন্যই বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের ওপর নিগ্রহ বাড়ছে।’

এই নিগ্রহ থেকে বাঁচার পথের দিশাও দেন সন্তু লারমা। বলেন, ‘আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দরকার নিরন্তর সংগ্রাম ও আন্দোলন।’ আর এ আন্দোলনে শুধু ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ নয়, বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক শক্তির সহায়তা চান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা।

সকালে আদিবাসী গানের দল মাদলের সদস্যদের গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ‘এখানে ভোর আসে’ গানের মাধ্যমে এসব শিল্পী তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। আজকের দিবসের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি; বরং আদিবাসীরা দিন দিন প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। তাদের জমিজমা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’

আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু স্বীকার করেন, দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ দ্বন্দ্বের অবসানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ওই চুক্তি করেছিলো। সেই চুক্তির অনেক কিছুই হয়তো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে চুক্তির সঠিক বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার সচেতন ও সতর্ক আছে।’

মন্ত্রী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের কাছে আবেদন করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অসাম্প্রদায়িকতার ছাতা ধরে রেখেছেন। তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভূমি ও সম্পদ দখলের যেন এক উৎসব চলছে। এর পেছনে লুটেরা ভূমিদস্যুরা।

লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে দুই শ্রেণির মানুষ দেশ ত্যাগ করে। এরা হলো মন্ত্রী-এমপি-বড় আমলাদের ছেলেমেয়েরা আর অন্যরা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার। মন্ত্রী-আমলাদের ছেলেমেয়রা উড়োজাহাজে করে দেশ ত্যাগ করে গিয়ে ওঠে নিজেদের দ্বিতীয় হোমে। আর ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ দেশ ত্যাগ করে হেঁটে। তারা সেখানে গিয়ে থাকে পথে পথে, গাছের তলায়।’

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী আজ ৯ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বাংলাদেশেও এসব জাতিসত্তার মানুষের সংগঠনগুলো পালন করে দিবসটি। দেশে ৫০টির বেশি জাতিসত্তার মানুষের বাস। বিভিন্ন প্রান্তে আজ দিবসটি পালিত হচ্ছে। বরাবরের মতো এবারো ঢাকায় কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এঁদের মধ্যে জেমসন বম এসেছেন বান্দরবানের রোয়াংছড়ি থেকে, নিখিল টুডু বরেন্দ্রভূমি রাজশাহীর পবা থেকে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের মণিপুরীপাড়া থেকে নিরেন সিনহা, পটুয়াখালীর রাখাইনপল্লিতে থেকে উ মে ম্রং। তাঁরা একা নন, দলে দলে এসেছেন আদিবাসী দিবস উদ্‌যাপনে।

আজকের অনুষ্ঠানে দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির বাণী পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস। আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রংয়ের পরিচালনায় বক্তব্য দেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন প্রমুখ।

আলোচনা পর্ব শেষে বাংলাদেশ আদিবাসী কালচারাল ফোরামের পরিবেশন করে নৃত্যানুষ্ঠান ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। এটি পরিচালনা করেন চন্দ্র ত্রিপুরা ও সাচিং মারমা। এ ছাড়া হাজং, সাঁওতাল, গারো ও মাহাতো জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক দলও নাচ-গান পরিবেশন করে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*