কে এই জেএমবির শীর্ষ নেতা বোমারু মিজান

ফাইল ছবি।

বিশেষ সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) অন্যতম শীর্ষ নেতা মিজান ওরফে বোমারু মিজানকে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জঙ্গি মিজান ওরফে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সুমন ওরফে মুন্না ওরফে বোমা মিজান মূলত ‘বোমারু মিজান’ নামেই বেশি পরিচিত। আর ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে তার নাম ‘কাওসার’। গত সোমবার ভারতের বেঙ্গালুরু শহরের এক গোপন আস্তানা থেকে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ তাকে গ্রেপ্তার করার পর আবারো আলোচনায় চলে এসেছে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলায় কেঁপে উঠেছিলো সারাদেশ। ওই দিন ৬৩ জেলায় একযোগে ৫৫৯টি বোমা বিস্ম্ফোরিত হয়। একসঙ্গে এতো বোমা তৈরির নেপথ্যে যে মূল ভূমিকা পালন করেছিলো, তার নাম ‘বোমারু মিজান’। সে মূলত পুরনো জেএমবির বোমা তৈরির মূল কারিগর। তার হাত ধরেই দেশে উগ্রপন্থিদের মধ্যে বোমা তৈরির হাতেখড়ি হয়। জঙ্গিরা ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির দীক্ষাও পায় বোমা মিজানের কাছে। তাই উগ্রপন্থিদের কাছে সে ‘বোমা মিজান’ হিসেবে পরিচিত। পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমানের অত্যন্ত কাছের লোক ছিলো সে। শায়খ রহমানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর জেএমবির হাল ধরতে বারবার এগিয়ে যায় বোমা মিজান। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা করে জেএমবির সদস্যরা বোমা মিজান, সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি ও রাকিবুলকে ছিনিয়ে নেয়। পরে রাকিবুল পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। আর বোমা মিজান ও সালেহীন ভারতে পালিয়ে যায়।

২০০৯ সালের ১৫ মে রাজধানীর কাফরুলের তালতলা থেকে বোমা মিজানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে তার মিরপুরের বাসা থেকে বোমা, বিস্ম্ফোরকসহ স্ত্রী হালিমাকেও র‌্যাব গ্রেপ্রতা করে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত কারাগারে ছিলো বোমা মিজান। মূলত প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবি নতুনভাবে তাদের শক্তি জানান দেয়। ওই ঘটনার পর রাকিবুল আটক হলেও সানি ও মিজানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মূলত ভারতে পলাতক থেকেই তারা সংগঠনের জন্য সদস্য সংগ্রহ করতে থাকে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের জেএমবির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করলেও দুই দেশের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো আলাদা। আল কায়দা ও আইএসের মতো একই নেতৃত্বের ব্যানারে তারা কাজ করে না। তবে তাদের আদর্শ এক ও অভিন্ন।

জানা গেছে, ত্রিশালে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জেএমবির শীর্ষ নেতা ফারুকের নেতৃত্বে ছিল শফিক, জাকারিয়া, মাজিদ, মিলন ও সবুজ। তারা মহাসড়কের কোন পয়েন্ট থেকে প্রিজনভ্যানে হামলা চালালে সুবিধা হবে, তার একাধিক জায়গা ঠিক করে। অপারেশনের পর ফারুকের নেতৃত্বে জেএমবির একটি দল ফের ভারতে চলে যায়।

জানা গেছে, ‘বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমান’ যুগে ফিরতে নতুন পরিকল্পনা করছিলো জেএমবি। এর মূল চরিত্রে ছিল বোমা মিজান ও সালেহীন। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জে প্রকাশক ও লেখক শাহজাহান বাচ্চু হত্যার মধ্য দিয়ে পুরনো জেএমবি নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি জানান দেয়। তারা দেশে ডাকাতি ও চুরিতে জড়ায়। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ সংগঠনে ব্যয় করে। পুরনো জেএমবির বাংলাদেশ ও ভারতে সক্রিয় তিনটি ধারার নেতৃত্বে রয়েছে পলাতক জঙ্গি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি, বোমা মিজান ও দেশে কারাবন্দি সাইদুর রহমান। পুরনো জেএমবি এখনও মনে করছে, তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে নব্য জেএমবি যে আদর্শ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, তা ভুল ছিল। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে নব্য জেএমবির পতন হয়।

১৯৯৮ সালে শায়খ আবদুর রহমানের হাত ধরে জেএমবি প্রতিষ্ঠা করার পর ২০০১ সালে সংগঠনটি প্রথম হামলা চালায়। ২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায় তারা। এরপর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪০টি হামলায় জড়িত ছিলো জেএমবি। এসব হামলায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। পুরনো জেএমবি বিভিন্ন সময় যত বোমা হামলা করেছিলো, সবক’টিতে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলো বোমা মিজান ও তার সাঙ্গপাঙ্গ।

এদিকে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) ২০১৬ সালে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলো, ভারতের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বোমারু মিজান কলকাতার আশপাশেই ঘাপটি মেরে আছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর একটি বিস্ফোরণে দুইজন নিহত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই বিস্ফোরণস্থলটি আসলে জামাতুল মুজাহিদিনের আস্তানা এবং বোমা ও অস্ত্র তৈরির কারখানা। প্রথম দিন থেকে জেএমবির যে ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন কাওসার। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবির দুই নারী সদস্য ও আরেক ব্যক্তি জানায়, কাওসারই মোটরবাইকে করে এসে ওই আস্তানায় তৈরি করা বোমা নিয়ে যেতেন।

কি পরিমাণ দেশি গ্রেনেড বানাতে হবে, সেটাও আগেভাগে বলে দিতেন তিনি। এমনকি, জঙ্গি আশ্রয়স্থল হিসেবে খাগড়াগড়ের ওই বাড়িটি নির্বাচনেও কাওসারের ভূমিকা ছিলো। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় পরবর্তী সময়ে এনআইএ জানতে পেরেছে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে পুলিশ ভ্যান থেকে ছিনতাই হওয়া জেএমবির জঙ্গি মিজানই হচ্ছে এই কাওসার।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই খাগড়াগড় মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এনআইএ। তাই বিচার শুরু হওয়ার আগেই গোয়েন্দারা কাওসারকে ধরতে চান। এর কারণ, পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জেএমবির পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা মাঝপথেই বানচাল করে দেওয়া যাবে, এড়ানো যাবে নতুন নাশকতার ঝুঁকিও। এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ মে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলায় বোমারু মিজানকে ২০ বছর এবং তার স্ত্রী হালিমা বেগমকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এ কারাদণ্ডের রায় দেন।

এর আগে ২০১২ সালের ৩ ‍জুন অপর এক অস্ত্র মামলায় ঢাকার অপর এক আদালত তাদের ৩৭ বছর কারাদণ্ড দেন। তারও আগে পৃথক দু’টি মামলায় তাদের ৩৬ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৫ মে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাবের একটি দল রাজধানীর মিরপুরে বোমারু মিজান ও তার স্ত্রী হালিমার একটি ভাড়াবাসা থেকে গ্রেনেড, অস্ত্র, গুলি ও বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ ঘটনায় র‌্যাবের ডিএডি আব্দুর রহিম বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেছিলেন। ওই বছরেরই ১৫ জুন আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*