ভাষাসৈনিক ও সাহিত্যিক হালিমা খাতুন আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
ভাষাসৈনিক ও সাহিত্যিক ড. হালিমা খাতুন আর নেই। আজ মঙ্গলবার (৩ জুলাই) দুপুর ১টা ৫৬ মিনিটে দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, রক্তদূষণের মতো নানা জটিলতা নিয়ে গত শনিবার এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৮৬ বছর বয়সী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক।

তার নাতনী অন্তরা বিনতে আরিফ প্রপা জানান, গত বৃহস্পতিবার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হালিমা খাতুন ১৯৩৩ সালের ২৫ অগাস্ট বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেন। তার বাবা মৌলবী আবদুর রহিম শেখ এবং মা দৌলতুন নেসা। বাদেকাড়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনমোহিনী গার্লস স্কুল, বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে পাঠ শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এমএ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ পাস করেন।

১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি করেন। ১৯৫৩ সালে খুলনা করোনেশন স্কুল এবং আরকে গার্লস কলেজে শিক্ষকতার মধ্যদিয়ে তার কর্মজীবনের সূচনা। কিছুদিন রাজশাহী গার্লস কলেজে শিক্ষকতার পর যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। এখান থেকে অধ্যাপক হিসেবে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হালিমা খাতুন জড়িয়ে পড়েছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে; পরে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামেও তিনি জড়িয়ে পড়েন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরের আমতলায় সমাবেশে তিনি ছাত্রীদের জড়ো করায় ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের আমতলায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৪৪ ধারা ভেঙে প্রথম বের হয় মেয়েদের দল। তার সদস্য থাকে চারজন- জুলেখা, নূরী, সেতারার সঙ্গে সারিতে ছিলেন হালিমা খাতুন। পরে ভাষা সৈনিকদের মিছিলে গুলি চালায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। সেই মিছিলে হতাহতদের ছবি তুলে রেখেছিলেন ছাত্ররা। সেই ছবিটি তারা লুকিয়ে রেখেছিলেন হলে। পরে সে ছবিটা বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন হালিমা খাতুনরা।

ভাষা সংগ্রামে আহত ছাত্র-জনতার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিলো। হালিমা খাতুন তার দল সংগঠিত করে চাঁদা তুলেছিলেন। পরে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন তিনি।

হালিমা খাতুন হলের মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা শহরে চাঁদা তুলেছেন। লিফলেট বিলি, পোস্টার লেখা এবং মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করা ছিলো হালিমা খাতুনের নিত্যদিনের রুটিন কাজ। ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোতে এসব কাজ করে তিনি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। হালিমা খাতুন পাড়ায় পাড়ায় মহিলাদের সংগঠিত করে ভাষা আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছেন। ভাষা আন্দোলনে তার সেই অনন্য অবদানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি তাকে ভাষা সৈনিক সম্মাননা প্রদান করে। হালিমা খাতুনের একমাত্র মেয়ে দেশের অন্যতম আবৃত্তিশিল্পী প্রজ্ঞা লাবণী।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*