পুলিশের ঈদ বাণিজ্য, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

প্রদীপ ঘোষ, যশোর প্রতিনিধি, পিটিবিনিউজ.কম।
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যশোর পুলিশের অর্থ বাণিজ্য তুঙ্গে উঠেছে। সাদা পোশাক পরিহিত কতিপয় পুলিশ সদস্যরা প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে পাড়া, মহল্লা, শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন বলে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে প্রকাশ, এই সব সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা সাধারণ পথচারি ও নিরীহ অসহায় মানুষের পাশাপাশি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়িদের আটক করে থানায় নিয়ে আসছে এবং আটক চিহ্নিত অপরাধীদের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ এবং পথচারী ও নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে পেইন্ডিং মামলাসহ মাদক মামলায় চালানের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে থানা থেকেই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।

আটককৃতদের নাম থানার আসামির রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি না করে দারোগাদের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এন্ট্রি করা হয়। অনেক সময় আটককৃত আসামিদের থানাতেও আনা হয় না। দারোগারা আটকৃতদের অজ্ঞাত স্থানে রেখে দেয়। ফলে আসামির স্বজনরা আটককৃতদের খোজে থানায় এসে পায় না। কর্তব্যরত ডিউটি অফিসারও আটককৃতদের সম্পর্কে স্বজনদের কোন তথ্য দিতে পারেন না। ফলে স্বজনরা চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর এসব কারণে তারা যতদ্রুত সম্ভব থানা থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের স্বজনদের ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। রোববার সকাল থেকে সোমবার বিকাল পর্যন্ত সাদা পোষাকে কোতয়ালি থানা পুলিশ কথিত অভিযোগে বিভিন্ন পাড়া, মহল্লা, শহর ও শহরতলীতে অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করে। আটককৃতদের অধিকাংশই সাধারন ও নিরীহ প্রকৃতির।

রোববার সকালে শহরের সিটি কলেজ পাড়া থেকে কথিত অভিযোগে শহরের আর এন রোডের মোটরপার্টস ব্যবসায়ি সুজন অটোর স্বত্তাধিকারি বাবুকে কোতয়ালি থানার এসআই আমিরুজ্জামান আটক করেন। আটকের সময় বাড়ির স্বজনরা জানতে চান বাবুকে কি অভিযোগে আটক করা হচ্ছে।

এসআই আমিরুজ্জামান বাবুর স্বজনদের বলেন, ওপরের নির্দেশে বাবুকে আটক করা হয়েছে। থানায় আনার পর বলা হয় বাবু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাকে মামলা দিয়ে চালান দেয় হবে। বাবুকে ছাড়াতে হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। পুলিশের কথা শুনে আটককৃত বাবুর স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে বাবুকে ছাড়াতে। বাবুর স্বজনদের উদ্বেক উৎকন্ঠা ও আতঙ্কিত হওয়ার ফলে পুলিশও পেয়ে বসে। বিভিন্ন মাধ্যম্যে দেনদরবার শুরু হয়। রোববার সকালে বাবুকে আটক করে থানায় আনার পর অবশেষে সোমবার সকালে রফা হয় দুই লাখ টাকায়। তাও আবার থানা থেকে ছাড়া হয় না বাবুকে।

সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে বাবু আটকের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার কারণে পুলিশ নিজেদের বাঁচাতে বাবুকে নেশাগ্রস্ত দেখিয়ে ৩৪ ধারায় সোমবার সকালে আদালতে চালান দেয়। চালান দেয়ার কয়েক ঘন্টা পর বাবু কয়েকশ টাকা জরিমানা দিয়ে বাইরে বের হয়ে যায়।

এদিকে বাবুকে এসআই আমিরুজ্জামান আটক করলেও আদালতে ফরোয়াডিং লিখে চালান দেয় এসআই আসাদ। বাবুকে কত টাকা নিয়ে ছাড়া হয়েছে জানতে চাইলে এসআই আসাদ এই প্রতিবেদককে জানান, টাকা পয়সার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ওপরের নির্দেশে আমি বাবুকে ৩৪ ধারায় চালান দিয়েছি। বাবু মধ্যপ অবস্থায় ছিলো। তাকে রোববার মেডিকেল করা হয়েছে। অথচ হাসপাতালের প্রথমিক চিকিৎসার খাতায় এক্সিডেন্টাল ইনজুরি দেখানো হয়েছে। যার রেজিঃ নং ৩৫৫৭০/২৩৩। জেনারেল হাসপাতালের ব্রাদার বাবুল আক্তারকে সোমবার বিকালে ফোন দিলে তিনি এতথ্য জানান।

বাবুকে কি অভিযোগে আটক করা হয়েছে জানতে চাওয়া হলে এসআই আমিরুজামান জানান, বাবুকে একটি অভিযোগে আটক করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সুনিদিষ্ট কোনো অভিযোগের কথা বলতে পারেননি। শুধু বলেন অভিযোগটি গোপনীয়।

বাবুকে ছেড়ে দেয়া হবে না তাকে মামলায় চালান দেয়া হবে জিজ্ঞাসা করা হলে আমিরুজ্জামান বলেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আছেন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন কি করা হবে।

আমি আপনাকে পরে জানাবো বলে এসআই আমিরুজ্জামান ফোন রেখে দেয়।

বাবুর আটকের ব্যাপারে কোতয়ালি থানার ওসি (অপারেশন) সামসুদ্দোহার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ৩৪ ধারায় চালান দেয় হয় বলে জানান।

বাবু ছাড়াও রোববার রাতে কোতয়ালি থানার এএসআই তহিদুল পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থেকে কোনো কারণ ছাড়াই এলজি কোম্পানীর মিস্ত্রি মাহাফুজুল আসলাম সানি ও মুরাদকে আটক করে।মাহাফুজুল শহরের কারবালা এলাকার গোলাম মোস্তফার ছেলে। মুরাদের বাড়িও একই এলাকায়। রাতে কাজ শেষে দুজন মোটরসাইকেলে করে কারবালার বাড়ি যাচ্ছিলো। পথ্যি মধ্যে পুলিশ সুপারের কার্যারয়ের সামনে থেকে তাদের মোটরসাইকেলের গতি রোধ করে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে দুজনকে থানা হাজতে রাখার পর সোমবার সকালে দেনদরবার শেষে ৫০ হাজার টাকায় রফা হয়।

এব্যাপারে এ এস আই তহিদুলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি শিকার করে বলেন, অতো টাকা নেওয়া হয়নি। একজনকে তো এমনিই ছেড়ে দিয়েছি।

এমন ধারায়ই যশোর পুলিশের কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সবাই নিরব। এ ব্যপারে কারো মুখে কোনো কথা নেই।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.