কমলাপুরে ট্রেন ছাড়তে দেরি, চাপ বাড়ছে বাস টার্মিনালগুলোতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। রাজধানী বা কর্মস্থলের জায়গা ছেড়ে আপনজনদের কাছে ফেরার পালা শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। ঈদযাত্রার চতুর্থ দিন আজ বুধবার সকালে কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় শুরু হয়েছে। তবে ট্রেন ছাড়তে দেরিতে অসন্তোষ জানিয়েছেন যাত্রীরা। আজ বাড়ি যাচ্ছেন ৪ জুন অগ্রিম টিকেট কেনা যাত্রীরা। এদিন সকালে রাজশাহী, দেওয়ানগঞ্জ, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট ও খুলনার উদ্দেশে পাঁচটি বিশেষ ট্রেন ছেড়ে যায়। সারাদিনে মোট ৫৯টি ট্রেন ছাড়বে কমলাপুর থেকে। এ সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ১০টি লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকছে বলে জানিয়েছেন কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্ত্তী। এদিকে, নীড়ে ফেরার এই স্রোতধারায় ঈদের চাপ বাড়ছে বাস টার্মিনালগুলোতে। আর বাসের অতিরিক্ত ভাড়া, নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দেরি করে আসাসহ রাস্তার যানজটের অনিশ্চয়তার মতো সমস্যাগুলোকে নিয়তির সঙ্গে মিলিয়ে মেনে নিয়েই ঘরে ফিরছেন সবাই।

সিতাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, বুধবার বেলা ১০টা পর্যন্ত কমলাপুর থেকে ২১টি ট্রেন ছেড়ে যায়।

সকালে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পর কমলাপুর স্টেশন ছেড়েছে। এরমধ্যে দুটি বিশেষ ট্রেনের দুটিই ছাড়তে দেরি হয়। দেওয়ানগঞ্জ ঈদ স্পেশাল ট্রেনের ছাড়ার সময় ছিলো সকাল পৌনে ৯টার; তা ছেড়েছে নির্ধারিত সময়ের পৌনে একঘণ্টা পর। লালমনিরহাটের লালমনি ঈদ স্পেশাল ট্রেন বেলা সোয়া ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। এটি ছাড়ে সকাল ১১টায়।

দেওয়ানগঞ্জ স্পেশাল ট্রেনের যাত্রী ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মী তারা মিঞা বলেন, সকাল ৮টায় এখানে এসে বসে আছি। কিন্তু ট্রেন ছাড়তে দেরি করছে। এখন তো আরো দেরি করবে। কখন পৌঁছাব জানি না।

রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও তা সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস কমিউটার ট্রেন সকাল সাড়ে ৯টার পরিবর্তে ২০ মিনিট দেরি করে বেলা ৯টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে গেছে। জামালপুরের তারাকান্দি রুটের অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সোয়া ৯টায় ছেড়েছে। এছাড়া দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেস ২০ মিনিট দেরি করে বেলা ১০টা ২০ মিনিটে ছেড়েছে।

নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাড়ার সময় সকাল ৮টায়। তবে ট্রেনটি আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সাড়ে ৮টায় গেছে।

অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনে ময়মনসিংহ যাচ্ছেন একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি আবদুল আলীম। ঈদে বাড়ি যেতে পেরে খুশি হলেও রেলসেবা নিয়ে অসন্তোষ জানান আলীম। তিনি বলেন, ট্রেনের ভেতরের অবস্থা ভালো না। দেখেন আমরা প্রথম শ্রেণির চেয়ার কোচের টিকেট কিনেছি। কিন্তু সিট ভাঙা। আবার কয়েকটি সিট পেছনে কাত হয়ে যায়। সোজা হয়ে বসা যায় না। আবার প্রথম শ্রেণিতে অনেক দাঁড়ানো যাত্রী নেওয়া হয় বলে প্রচণ্ড ভিড়ে কষ্ট হয়।

ট্রেনের সেবা আরো উন্নত করা সময়ের দাবি বলে মনে করেন অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের আারেক যাত্রী আব্দুল খালেক। অবসরপ্রাপ্ত এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগে টিকেট কেনা থেকে শুরু হয় ভোগান্তি। টিকেট কেনার জন্য মানুষকে কি ভোগান্তিটা পোহাতে হয়। ছোট্ট একটা জায়গায় হাজার হাজার মানুষ। সেখানে সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় টিকেট পাওয়া যায় না। আর রেলের কোচ-বগি এসবের সঙ্কট তো আছেই। এসব বাড়ানো খুব জরুরি।

তবে এসব কষ্ট বাড়ি যাওয়ার আনন্দের কাছে ‘কিছুই না’ মিরপুরের গৃহিনী শামীমা মেহফুজের কাছে। একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের এই যাত্রী পরিবারের সঙ্গে দিনাজপুর যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বাড়িতে বাবা-মা ও শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন। এছাড়া আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দই তো অন্যরকম। এছাড়া ঈদের পরে আমার ছোটভাইয়ের বিয়ে। গরম অনেক এজন্য কিছুটা কষ্ট হচ্ছে তবে এটা খুব বেশি কিছু না।

বুধবার আগের চেয়ে ভিড় বেশি হয়েছে বলে জানান কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, কয়েকটি ট্রেন সামান্য দেরি করেছে, এটা বড় কিছু নয়। বিভিন্ন কারণে কয়েকটি ট্রেন দেরি করে গেছে। তবে ঈদের সময় ১৫-২০ মিনিট দেরি করে যাওয়া বড় কিছু নয়। এটা ঠিক হয় যাবে।

এদিকে, আজ রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই যাত্রীরা ভিড় করছেন টার্মিনালটিতে। কেউ বসে আছেন অগ্রিম টিকিট কাটা বাসের অপেক্ষায় আর কেউবা আছেন টিকিট পাওয়ার অপেক্ষায়। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন উত্তরবঙ্গ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও সিলেট পথের দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গ ও সিলেট রুটের ক্ষেত্রে অগ্রিম টিকিটের যাত্রীদের দেখা গেলেও বাকি অন্যান্য রুটের ক্ষেত্রে অগ্রিম টিকিটের কোনো বালাই নেই। যাত্রীরা আসছেন, টিকিট নিচ্ছেন, বাসের সিট পরিপূর্ণ হলেই বাস ছেড়ে দিচ্ছে। তাছাড়া এই রুটের পরিবহনগুলোর ক্ষেত্রে নেই তেমন কোনো অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ। এ কারণেই ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে দেখা গেছে যাত্রীদের। আবার টার্মিনাল এলাকা ছাড়াও মহাখালী এলাকার রাস্তার পাশেও দেখা গেছে গাড়ির দীর্ঘ লাইন।

টাঙ্গাইলের নিরালা পরিবহন ও বিনিময় পরিবহন সাধারণ ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি নিচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর রুটের বাসগুলোর ক্ষেত্রেও ৫০ টাকার বেশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের খবর মেলেনি। কিন্তু উত্তরবঙ্গ পথের বাসগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রিম টিকিট দেয়া থেকে শুরু করে ভাড়া পর্যন্ত ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন যাত্রীরা। তবে বাড়ি ফেরার আনন্দে বা যাওয়ার মানসিক বাধ্যবাধকতার জন্য এসব ভোগান্তিকে সহজে মেনে নিয়েই ফিরছেন বাড়িতে।

অভিযোগ রয়েছে, কাউন্টার থেকে ইচ্ছে করেই বিক্রি হয়ে গেছে বলে অগ্রিম টিকিট আটকে রাখা হয়। এরপর যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হয়। যে কারণে রাজধানীর অন্যান্য বাস টার্মিনালগুলোতে অগ্রিম টিকিটের প্রাধান্য বেশি থাকলেও এই টার্মিনালে তা নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখী একতা পরিবহনে মঙ্গলবার (১২ জুন) অগ্রিম টিকিট করেছিলেন আব্দুল আলীম ও তার তিন বন্ধু। তারা রাজধানীতে গার্মেন্টসে কাজ করেন। ঈদে বাড়ি ফিরছেন সবাই একসঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়ায় অগ্রিম টিকিট কিনে। এ সময় তারা বলেন, আমরা গতকাল একতা পরিবহনে এসে টিকিট কিনেছি। এক একটা সিট সাড়ে ৭০০ টাকা করে তিন হাজার টাকা রেখেছে। অথচ টিকিটে লিখে রেখেছে দুই হাজার ৫২০ টাকা। তারপর বাস ছাড়ার যে পূর্বনির্ধারিত সময় ছিল, সে সময়েও বাস ছাড়ছে না। কখন ছাড়বে তার কোনো সঠিক সময় জানাচ্ছে না। তবে এসব কিছু মেনে নিই। প্রতিবারই তো হয়। এটাকে ভাগ্য বলেই মেনে নিই।

এদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করতে কমলাপুর স্টেশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য কাজ করছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.