গড়াই নদীর বুক থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন চলছেই

অরিন্দম রহমান, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি, পিটিবিনিউজ.কম
ঝিনাইদহের শৈলকুপার কাতলাগাড়ী ঘাটের গড়াই নদীর বুক থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি ও বালু শ্রমিকের পাশাপাশি সেখানে ৪ থেকে ৫ টি ভেকু ম্যাশিনের মাধ্যমেও নদীর বুক ও কিনারা খুড়া হচ্ছে। এতে করে সেখানের ফসলি জমি ও বসতবাড়ী হুমকির মুখে পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে ও নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের এলাকা নদী গর্ভে বিলিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া কাতলাগাড়ী এলাকা এখন ধুলি ধোঁয়া-শব্দ দূষনের অন্যতম বাজার। যানজটে নির্বিকার এলাকাবাসী, চরম ঝুকিতে রয়েছে ওই এলাকাবাসী। বাজারের প্রধান সড়কে থাকা ঔষুধ, হোটেল, মুদিসহ বিভিন্ন খাদ্য জাতীয় দোকানীরা প্রভাবশালীদের দাপটে নির্বিকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে।

প্রতিদিন কাতলাগাড়ী বাজার অদূরে গড়াই নদীর অবৈধ বালি মহল ব্যবহার করে নাটা হাম্বার, মিনি ট্রাক, বড় ট্রাক মিলে প্রায় শতাধিক গাড়ী দিনভর বালি নিয়ে যায় দূর দূরান্তে। নদীতে ভেকু মেশিন লাগিয়ে গাড়ী ভর্তি বালি তুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ইটভাটা, রোড, ব্রীজ কালভার্টসহ পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, কৃষ্ণনগর চর হইতে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে গড়াই নদী থেকে নিয়মিত বালি বিক্রি করে। প্রতিদিন বালি ও ফসলী জমির মাটি কাটা চলে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর ফিটনেস বিহীন ছোট বড় নানা প্রকার যানবাহনে করে নিয়ে যাওয়া ইটভাটাসহ বিভিন্ন যায়গায় বিক্রির জন্য।

কাতলাগাড়ী বাজারের প্রধান সড়ক ঘেঁষে মৌবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাতলাগাড়ী নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা, গোয়ালবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাতলাগাড়ী ডিগ্রি কলেজ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন ও ব্যক্তিগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত লেখাপড়া করে। বাজার কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে উপজেলার বৃহৎ কাঠশিল্প কারখানা, দুটি বাজার, যার মধ্যে কাতলাগাড়ী নতুন বাজারেই রয়েছে কয়েক’শ ব্যবসায়ী এবং বাজার ঘেঁষেই রয়েছে তাঁতপল্লী এলাকা।

আর এসব মানুষের একমাত্র চলার পথ হচ্ছে এ বাজারের পাউবোর প্রধান সেচখালের বহুপুরনো জরাজীর্ণ একটি ঝুকিপূর্ণ সেতু। রাতদিন ভারী যান চলাচলের জন্য যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি। এছাড়া অদক্ষ ড্রাইভারদের বেপরোয় মাটি ও বালি ভর্তি ট্রাক চলাচলে প্রতিবছরই ঝড়ছে এসব এলাকার মানষের প্রাণ।

বালিমহল ব্যবহারকারীরা সরকারি দলের প্রভাবশালী হওয়ার কারনে স্থানীয় জনসাধারণ ভয়ে কিছু বলতে পারেনা। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিধ্বস, পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি গড়াই নদীর এ বালিমহল দখলকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামাও কম ঘটেনি। দিনশেষে হাজার হাজার টাকার বালি বিক্রির টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়েও রয়েছে নানা হামলা, মামলা সংঘর্ষের ঘটনা।
এলাকাবাসীর দাবি, অবৈধ বালিমহল বন্ধ করে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ ভূমিকা রাখবে একই সঙ্গে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষাসহ বাজারের পরিবেশ দূষণ থেকে এলাকাবাসীর মুক্তি মিলবে। অনেকটা ভূমিদস্য কায়দায় আবাদী ফসলের জমি কেটে মাটি নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন ইটভাটায়। কেউ বাধা দিলে তাকে রাতের অন্ধকারে গুনতে হয় মোটা অংকের চাঁদা, হয়রানি হতে হয় বিভিন্ন সময়ে।

চরে কর্মরত এক শ্রমিক জানান, প্রতিটি বড় ট্রাক ৫০০ টাকা, ট্রাক্টরচালিত ইঞ্জিন গাড়ী ৪০০ টাকা, নাটা হাম্বার ৩৫০ টাকা ও অন্যান্য সকল পরিবহন ২২০ টাকা হারে নিয়মিত বালি বিক্রয় হয়। এ চরে নিয়মিত শতাধিক যানবাহন বালি পরিবহনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এছাড়া বালি মহলকে কেন্দ্র করে শৈলকুপা অংশের প্রশাসন মাসিক মাসোহারা ৮০ হাজার টাকা ও খোকসা প্রশাসন এক লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে থাকে।

বালি উত্তোলনকারী কৃষ্ণনগর গ্রামের আতিয়ার ও মাটি ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেন জানান, গড়াই নদীর চরে জমির চারিদিক থেকে ভূমি দস্যুরা মাটি কেটে নেওয়ায় প্রতিবছর আমাদের নিজ নিজ জমি নদীতে বিলিন হয়ে যায়। যেকারণে নিজেদের সংসার চালানোর তাগিদেই মাটির ব্যবসা করি। তাছাড়া গড়াই চরটি পার্শ্ববর্তি খোকসা থানাধীন, বালি উত্তোলনের সঙ্গে ওপারের ব্যবসায়ীরা বেশী জড়িত।

খোকসা বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বাবুল আক্তার জানান, সীমানাটি খোকসার হলেও দৃশ্যমান নদীর ওপার অংশে হওয়ার কারণে চরের প্রায় সকল সুযোগ সুবিধাই ভোগদখল করেন শৈলকুপার সারুটিয়া ইউনিয়নের মানুষ। তিনি বলেন, এ চরকে ঘিরে অনেকবার খোকসা থেকে মোবাইল কোর্ট করা হলেও অবস্থানগত এবং নানা আইনী জটিলতার জন্য বালি খোরদের হাত থেকে নদী ও পরিবেশ রক্ষা করা তার একার পক্ষে সম্ভব হয় না।

এবিষয়ে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা উসমান গনি বলেন, আমাদের অংশে কেউ গড়াই নদী থেকে বালি উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া খোকসা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে যৌথ ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

নদী পাড়ের ফসলি জমি ও শত শত বসতবাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হওয়ার আগেই অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে এখনই প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলে ভূক্তভোগীরা মনে করেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*