সবুজ প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি

কামরুল ইসলাম চৌধুরী
সবুজ অর্থনীতি, সবুজ প্রবৃদ্ধি আর সবুজ উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কম কার্বন খরচ করে যে বিকাশ; পরিবেশ-প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্যের হাত ধরাধরি করে যে অগ্রগতি, তাকেই সরলভাবে সবুজ প্রবৃদ্ধি বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি না করে যে প্রবৃদ্ধি, তা-ই হলো সবুজ প্রবৃদ্ধি।

সবুজ প্রবৃদ্ধি হলো এমন নীতি ও পদ্ধতি, যা পরিবেশবান্ধব উপায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে। তাহলেই টেকসই উন্নয়ন অর্জিত হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব কেবল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বা এর অধীন বিভাগগুলো নয়, বরং এটা প্রত্যেকের কাজ। সরকারের সব দপ্তরের কাজ এটা। বেসরকারি খাতের এ ক্ষেত্রে রয়েছে বড় ভূমিকা। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এই প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার সঙ্গে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের একাধিক সংস্থাকে একসঙ্গে নিয়ে এসে কাজ করার সক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে।

বাংলাদেশে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিষয়টিকে মূলধারায় আনতে হবে। নীতি সংস্কার করতে হবে। সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জন করার প্রয়োজনের সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সর্বাধিক সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করে সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, দূষণ হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোর সঙ্গে সবুজ প্রবৃদ্ধির এ ধরনের সম্পৃক্ততার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সবুজ প্রবৃদ্ধির রাজনৈতিক অর্থনীতি আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে।

সবুজ প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক সংলাপের (ইডিজিজি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি ইতিমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত অংশীজনেরা সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আগ্রহী। বাংলাদেশেও সব অংশীজনের মধ্যে সেই আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

জাতীয় অগ্রাধিকারসমূহ
সবুজ প্রবৃদ্ধির রাজনৈতিক অর্থনীতির আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবুজ চাষাবাদ পদ্ধতির প্রয়োগ কৃষি উৎপাদন ৫৯ থেকে ১৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে; এবং প্রতি ১০ শতাংশ কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হলে দারিদ্র্য ৫-৭ শতাংশ কমে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন
সবুজ প্রবৃদ্ধি লাভের অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল লাভের বিষয়ে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর কাছে জোরালো দাবি জানাতে পারে।

দূষণ রোধ
দূষণের মাত্রা প্রশমন হচ্ছে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ উপকার লাভ এবং এ ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি
টেকসই নির্মাণ, টেকসই বনায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন খাতগুলোতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সাফল্য দেখিয়েছে।

তবে দেশে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সংস্কারের পথে বেশ কিছু শক্ত বাধা রয়েছে (বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুবিধার অভাবে রয়েছে) এবং এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বেসরকারি খাতে রয়েছে নানা দুর্বলতা ও উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রয়াসে বনেদি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে আসাই একমাত্র কাজ নয়, বরং বেসরকারি খাতকে এতে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাজারমুখী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রবল অগ্রাধিকারের মনোভাব এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশে সফলভাবে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই বাংলাদেশে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রভাবিত করার মূল রাজনৈতিক অর্থনীতির নায়কদের সামর্থ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল তৈরি করতে হবে।
ইডিজিজির সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় অংশীজনদের কার্যকলাপের বিভিন্ন সুযোগ ও

প্রভাবগুলো বিবেচনা করে কয়েকটি সুপারিশ রাখা হয়েছে:
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের উদ্যোগের মাধ্যমে সুস্পষ্ট স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। খাতভিত্তিক সবুজ প্রবৃদ্ধি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণসহ একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় ব্যাপক সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল প্রণয়ন করা।
পরিবেশগত ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (ইসিসি) ইস্যু করার প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের তাদের নিকটবর্তী এলাকায় টেকসই বর্জ্য অপসারণ ও পুনর্ব্যবহারের রীতি গ্রহণ করে স্থানীয় সরকার জাতীয় ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের আওতাভুক্ত এলাকার জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। পরিবেশ অধিদপ্তরের জনশক্তির তীব্র ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনা করে

বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত পান উৎপাদনকারী খাতে ইটিপি পরিচালনা নিয়মিত পরিদর্শন করার কাজে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োজিত করা যেতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ না করেই যাতে নাগরিকেরা পরিবেশ আদালতে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্যে পরিবেশগত আদালত আইন, ২০১০

সংশোধন করা, আদালতে বিচার প্যানেলে যোগ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য পদ তৈরি করা এবং দেশে বিদ্যমান সব আইন ও বিধিমালায় নির্ধারিত পরিবেশগত বিধি অনুযায়ী মামলা পরিচালনার অনুমোদন প্রদান করা।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধি, ১৯৯৭ সংশোধন করা, যাতে পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের জন্য যথেষ্ট আর্থিক জরিমানা করা যায়, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং ইসিসি ইস্যু করার ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা আরোপ করা যায় এবং পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ শক্তিশালী করা যায়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক বেসরকারি খাত থেকে সবুজ এফডিআই ও প্রভাব বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কৌশল প্রণয়ন করবে এবং বিনিয়োগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে সবুজ ওডিএ আকৃষ্ট করার জন্য কৌশল প্রণয়ন করবে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫ শতাংশ সরাসরি সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নির্ধারিত কোটা বরাদ্দের অনুমতি প্রদান করা, যাতে দেশের গ্রামাঞ্চলে সেবায় নিয়োজিত এনজিওগুলোর দক্ষতা গ্রামাঞ্চলের সবুজ প্রবৃদ্ধি জোরদারকরণে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত গণমাধ্যম সংলাপেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সবুজায়নের ভূমিকা পালনকারী সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বেসরকারি খাত হচ্ছে বিশেষভাবে শক্তিশালী একটি খাত। সংস্কারের বিরোধিতা মোকাবিলায় সবুজ পরিবর্তন সাধনে তাদের খুবই প্রয়োজন।

সার কথা হলো, সবুজ প্রবৃদ্ধি এলে আমার উন্নয়ন হবে। কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্য দূর হবে। বনবাদাড় উজাড় হবে না। নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হবে না। দখল হবে না। কলকারখানা দূষণ ছড়াবে না। কার্বন নিঃসরণ বাড়বে না। পরিবেশ দূষিত হবে না। প্রতিবেশ বিনষ্ট হবে না। টেকসই উন্নয়ন অর্জিত হবে। সৌজন্যে প্রথম আলো

কামরুল ইসলাম চৌধুরী: বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি
ইমেইল: quamrul 2030 @gmail. com

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*