ঈদে নৌনিরাপত্তায় পাটুরিয়া ও শিমুলিয়ায় সেনা মোতায়েনসহ ১০ সুপারিশ

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সংগঠনের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়া। ছবি: এমডি নাসিরউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম
দুর্যোগ মৌসুম বিবেচনায় নিয়ে আসন্ন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় উপকূল, হাওর, দ্বীপাঞ্চল ও পাহাড়ী জনপদে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখার দাবি জানিয়েছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি। এছাড়া সারা দেশে নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে শিমুলিয় ও পাটুরিয়ায় সেনা মোতায়েনসহ ১০টি সুপারিশ করেছে বেসরকারি সংগঠনটি। আজ সোমবার সকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে ‘চলমান দুর্যোগ মৌসুম, আসন্ন ঈদুল ফিতর ও নৌ নিরাপত্তা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়ার সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান সেলিম, শিশু সংগঠন খেলাঘরের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক তাহমীন সুলতানা স্বাতী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, বাংলাদেশ ইনল্যান্ড মাস্টার্স এসোসিয়েশনের (বিমা) সভাপতি ক্যাপ্টেন কাজী আব্দুল হক, পুরানা ঢাকা পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজিম।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাতীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সঞ্জীব বিশ্বাস, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জসি সিকদার, নির্বাহী সদস্য মঈনউদ্দিন সেখ মোহন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নৌপথ ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দুর্যোগ মৌসুম ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই সময়ের মধ্যেই ইদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। ফলে নৌপথের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই নিরাপত্তার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো :

১. পদ্মার শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ি ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল নির্বিঘœ করতে পহেলা রমজান থেকে এ দুই স্থানে সেনাবাহিনী মোতায়েন।
২. অবিলম্বে সকল নদীবন্দর ও নৌপথে ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম শুরু ও বছরজুড়ে অব্যাহত রাখা।
৩. অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চলাচল বন্ধে উপকূলীয়, হাওর ও পাহাড়ী জনপদের জেলা পুলিশ প্রশাসনকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার সম্পৃক্তকরণ।
৪. নৌযানের ফিটনেস যথাযথভাবে পরীক্ষার জন্য নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিপ সার্ভেয়ার নিয়োগ।
৫. ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম সারা বছর সচল রাখতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে অবিলম্বে আরও অন্তত তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদায়ন।
৬. নৌ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের মামলাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে অবিলম্বে সরকারি আইনজীবী নিয়োগ এবং বার কাউন্সিলের সনদবিহীন প্রসিকিউটিং কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার।
৭. অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা পদ্ধতি স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত মাস্টার ও ড্রাইভারের সমন্বয়ে পরীক্ষা কমিটি গঠন।
৮. দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টার ও ড্রাইভারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এইচএসসি পাস, পরীক্ষার আগে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং ৩০ নম্বরের রচনামূলক ও ২০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র বাধ্যতামূলককরণ।
৯. নৌ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ীদের শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য অভিজ্ঞ নৌপ্রকৌশলী, নৌস্থপতি, মাস্টার মেরিনার, নৌ পরিবহনবিষয়ক গবেষক, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, নৌযান মালিক প্রতিনিধি, সিনিয়র গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের সমন্বয় জাতীয় তদন্ত কমিটি গঠন।
১০. সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও নৌনিরাপত্তার স্বার্থে অর্ধলক্ষাধিক অবৈধ নৌযানকে আইনের আওতায় আনতে অবিলম্বে সারা দেশে নৌশুমারি শুরু।

এছাড়া নৌ দুর্ঘটনার গত তিন মাসের তথ্য তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৩৩টি নৌ দুর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১০টি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও পাঁচজন আহত, ফেব্রুয়ারিতে ছয়টি দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত ও সাতজন আহত এবং মার্চে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তিন মাসে দুর্ঘটনাকবলিত নৌযানগুলোর অধিকাংশই পণ্যবাহী; যে কারণে প্রাণহানি কম ঘটেছে। তবে জানুয়ারি মাসে তিনটি পণ্যবাহী ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। হতাহতের ঘটনা খুব বেশি না ঘটলেও মাস্টার-ড্রাইভারদের (চালক) অদক্ষতা, নাব্যতা সংকট ও ডুবোচরের কারণে বেশ কয়েকটি লঞ্চ চরে আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে গত তিন মাসে সংঘটিত অধিকাংশ দুর্ঘটনাই চালকদের খামখেয়ালিপনা ও অদক্ষতার কারণে ঘটেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.