ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে ভোট ছাড়াই নতুন নতুন কমিটি

ডেস্ক রিপোর্ট, পিটিবিনিউজ.কম
ভোট কার্যত উধাও হয়ে গেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো থেকেও। ব্যবসায়ীরা এখন আর নিজ নিজ সংগঠনের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ পান না। জেলা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন জেলা চেম্বারগুলোর সিংহভাগ কমিটি হয়েছে ভোটাভুটি ছাড়া। পণ্যভিত্তিক সংগঠনগুলোতেও কমিটি হচ্ছে চাপিয়ে দেয়া সমঝোতার মাধ্যমে। সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ নির্বাচনের মতো ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নির্বাচনেও প্রতিযোগিতা বিদায় নিয়েছে।

সারা দেশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬৪টি জেলা চেম্বারের মধ্যে ৪৭ টিতেই সর্বশেষ কমিটি হয়েছে কোনো রকমের ভোটাভুটি ছাড়া। পাঁচটিতে আংশিকভাবে ভোট হয়েছে। একটিতে ভোটাভুটি নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। পূর্ণ ভোটাভুটি হয়েছে মাত্র ১১টি চেম্বারে। খবর পাঠকের কন্ঠ।

পণ্যভিত্তিক বড় সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (রিহ্যাব) কিছু সংগঠনে এখন আর ভোট হচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) কমিটিও হয়েছে আংশিক ভোটাভুটির মাধ্যমে।

ভোট না হওয়ার মূল কারণ সংগঠন দখলে রাখার চেষ্টা। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হতে পারলে নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া, রাজনৈতিক দলের পদ পাওয়া, এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে যাওয়ার সুযোগ হয়। পাশাপাশি নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়। এসব কারণে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে যেকোনোভাবে নেতা হওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলের নেতারাও ব্যবসায়ী সংগঠনের পদ দখলে রাখতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে সরকারও সমাজের প্রভাবশালী পক্ষ ব্যবসায়ীদের নিজের পক্ষে রাখতে চায়। এজন্য প্রধান সংগঠনগুলোতে দলীয় অথবা অনুগত ব্যবসায়ীদের নেতা বানানো নিশ্চিত করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাণিজ্য সংগঠনগুলো নামে ব্যবসায়ীদের সংগঠন হলেও তারা রাজনৈতিক অঙ্গনের ছায়া হিসেবে কাজ করছে। তারা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সহায়তাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি শুরু হয়, তখন তার অবশ্যম্ভাবী উপসর্গ হয় জবাবদিহির অভাব। আমাদের দেশে সেটাই হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সুশাসনের ঘাটতি সামাজিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে শুধু ভোট বিদায় নিয়েছে তা নয়, বিনা ভোটের কমিটিতে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পদধারীরা। এফবিসিসিআইয়ের দুজন সহসভাপতিই সরকারি দলের নেতা। জেলার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কমপক্ষে ২০ টির সভাপতি পদে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা স্থান পেয়েছেন। অনেক কমিটির শীর্ষ পদটিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের স্বজনেরা আসীন হয়েছেন।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও সহসভাপতি কে হবেন, তা ঠিক করে দেয় সরকার। ফলে বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সভাপতি পদে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এমনকি সহসভাপতির দুটি পদেও নেতা ঠিক হয়েছে সরকারের আশীর্বাদে। ব্যবসায়ী মহলের আলোচনাই হচ্ছে এফবিসিসিআই কার্যত সরকারের ব্যবসায়ী শাখা।

সংগঠনটির সর্বশেষ নির্বাচনে বর্তমান কমিটির সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন না। এমনকি বরাবরের মতোই সংগঠনটির সভাপতি ও দুজন সহসভাপতি হয়েছেন সরকারের আশীর্বাদ পেয়ে। তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। বর্তমান দুই সহসভাপতির একজন যুবলীগের নেতা শেখ ফজলে ফাহিম। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলে। অন্যজন সাবেক ডেপুটি স্পিকার আলী আশরাফের ছেলে মুনতাকিম আশরাফ। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি।

এফবিসিসিআইয়ের সর্বশেষ সাতজন সভাপতির ছয়জনই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য, প্রয়াত আনিসুল হক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। আগে থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন আওয়ামী লীগের সাংসদ। আরেক সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা। অন্যদিকে আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।

দেখা গেছে, স্থগিত হওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনা প্রায় সবাই ছিলেন ব্যবসায়ী। বিএনপির প্রার্থীও ব্যবসায়ী।
হলফনামা বিশ্লেষণ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ২০১৪ সালে জানায়, দশম সংসদের সাংসদ হওয়া ১৭৫ জনের পেশা ব্যবসা। ফলে সংসদে ব্যবসায়ীদের হার এখন ৫০ শতাংশ।

জেলা চেম্বার ভোটহীন, কমিটিতে দলীয়রা
এফবিসিসিআই ও বড় বড় পণ্যভিত্তিক সংগঠনের নির্বাচনে নেতা হতে যেমন সরকারের আশীর্বাদ লাগে, তেমনি জেলা চেম্বারের নেতা হতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতার সুদৃষ্টির প্রয়োজন হচ্ছে। অবশ্য নিজে আওয়ামী লীগের নেতা হলে ভোট ছাড়াই সভাপতি হওয়া যাচ্ছে।

বরিশাল চেম্বারের সাইদুর রহমান মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছেন। ভোলা চেম্বারের আবদুল মমিন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনিও ভোট ছাড়া কমিটিতে এসেছেন। কুমিল্লা চেম্বারের মাসুদ পারভেজ খান জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। এই চেম্বারে দীর্ঘদিন ভোট হয় না। ঝিনাইদহ চেম্বারের সাইদুল করিম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনিও ভোট ছাড়া সভাপতি। কুষ্টিয়া চেম্বারের রবিউল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি আবার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। দুবার ভোট ছাড়া সভাপতি হয়েছেন। সুনামগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি খায়রুল হুদা জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক। তাঁর কমিটিতেও ভোট হয়নি।

আওয়ামী লীগের বাইরে জেলা চেম্বারের সভাপতি পদে সংসদে বিরোধী দল ও সরকারের অংশ জাতীয় পার্টির নেতা আছেন পাঁচটি চেম্বারের সভাপতি পদে। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা আছেন পাঁচটি চেম্বারের প্রধান হিসেবে।

ভোটাভুটি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ভোটের মাধ্যমে সবকিছু হওয়া সব সময় ভালো জিনিস। কিন্তু অনেক সময় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেয়, সেটা সঠিক নয়।

পণ্যভিত্তিক সংগঠনেও ভোট হয় না
সাড়ে সাত বছর ধরে বিকেএমইএর সভাপতি পদ আঁকড়ে আছেন নারায়ণগঞ্জ- ৫ আসনের সাংসদ এ কে এম সেলিম ওসমান। ২০১২ সালের পর থেকে ব্যবসায়িক সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন হচ্ছে না। বিকেএমইএর কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। তখন সভাপতি পদ ধরে রাখতে কৌশলের আশ্রয় নেন সেলিম ওসমান। নারায়ণগঞ্জে সংগঠনের প্রধান কার্যালয় বিকেএমইএ কমপ্লেক্স নির্মাণের অজুহাত দেখিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে কমিটির মেয়াদ ছয় মাস করে দুই দফা বাড়িয়ে নেন সেলিম ওসমান। এরপর সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে নতুন করে দুই বছরের জন্য সভাপতি হয়েছেন সেলিম ওসমান।

দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএতে সর্বশেষ ২০১৩ সালে ভোট হয়েছিলো। তারপরই সমঝোতার ভিত্তিতে সংগঠনটির দুই পক্ষ- সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম বিজিএমইএর নেতৃত্ব ভাগাভাগির বিষয়ে চুক্তি করেন। ফলে এখানেও আর ভোট হয় না। সংগঠনটির বর্তমান কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর পর চলতি মাসে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু বর্তমান কমিটির মেয়াদই এক বছর বাড়িয়ে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে দুই বছরের জন্য গঠিত কমিটি শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করবে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবে আগে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাভুটি হতো। ২০১৪ সাল থেকে রিহ্যাবে ভোটাভুটি হয় না। সমঝোতার মাধ্যমেই দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতি পদে আছেন আলমগীর শামসুল আলামিন। বর্তমান কমিটির মেয়াদ নতুন করে ছয় মাস বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানালেন একজন নেতা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন পরিচালকের (ডিটিও) কার্যালয় অর্থাৎ ডিটিও অনুবিভাগ বিদ্যমান ১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশে দেয়া ক্ষমতাবলে সংগঠনগুলোর মেয়াদ একের পর এক বাড়াচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিটিও মো. ওবায়দুল আজম বলেন, ভোটাভুটির পরিবর্তে সমঝোতার বিষয়ে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কোনো দরখাস্ত এলে মন্ত্রণালয় যাচাই করে তার অনুমোদন দেয়। মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তাই করা হয়। এখানে মন্ত্রণালয়ের নিজের স্বার্থের কিছু নেই।

ভোট উধাও হওয়ায় মূলত ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদেরই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের আশীর্বাদে নেতা হওয়া ব্যবসায়ীদের কাজ সরকারকে কাজে সমর্থন দেয়া। ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতি রাজনৈতিক মদদপুষ্ট অথবা সমর্থনপুষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের অগ্রাধিকারে থাকে না। তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ফলে এসব সংগঠন নীতিনির্ধারণে প্রভাব ও গুরুত্ব ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশে বৈষম্যের সুযোগে সমাজের একটি অংশ এখন অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। এর কিছু অংশ ব্যবসায়ী, কিছু অংশ রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, যার উদ্দেশ্য রাজনীতিকে প্রভাবিত করা। তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনগণের প্রতি আগের মতো অঙ্গীকার নেই। এ কারণে অর্থশালী রাজনৈতিক পক্ষ ও ব্যবসায়ী পক্ষের মধ্যে এই ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো থেকে ভোট বিদায় রাজনৈতিকীকরণের অংশ কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা যেভাবে শক্তি অর্জন করা যায়, সেভাবেই করবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.