পদ্মায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১০৩ বছর পার হলো

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে প্রমত্তা পদ্মার ওপর নির্মিত রেলসেতু `হার্ডিঞ্জ ব্রিজ'।ছিবি: পূষ্পেন রায়

পূষ্পেন রায়, পিটিবিনিউজ.কম
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে প্রমত্তা পদ্মার ওপর নির্মিত রেলসেতু, বিশ্বব্যাপি পরিচিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১০৩ বছর পার করলো। গত ৪ মার্চ পূর্ণ হলো ইংরেজ শাসকদের নির্মাণ করা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ব্রিজটির ১০৩ বছর। স্থানীয়ভাবে ‘পাকশী সেতু’ বা ‘পাকশী ব্রিজ’ নামে খ্যাত এই সেতু ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি উদ্বোধন করেন। পরে তাঁর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’। মূলত আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়েই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের গোড়াপত্তন হয়।

রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের জন্য ১৯০৯ সালের প্রথমদিকে জরিপ ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়। এরপর প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ সেতুর নির্মাণকাজ; যা শেষ হয় ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরপরই ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি সেতুটির ওপর দিয়ে মালগাড়ি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি আপ মালগাড়ি চলাচল শুরু হয়। একই বছরের ৪ মার্চ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এরপর এর ওপর দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ভারত সরকার সেতুটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত ইস্পাতের ট্রাসেলটি কংক্রিট দিয়ে ‘জ্যাকেটিং’ করার পর এর ওপর দিয়ে একক ব্রডগেজ লাইন বসিয়ে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর থেকে সীমিত গতিতে ট্রেন যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী নিজে ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে হার্ডিঞ্জ সেতু পার হয়ে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন উপলক্ষে প্রদত্ত এক বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় বলেছিলেন, “এ সেতুর পুর্নর্নিমাণ জাতীয় পুনর্গঠন কাজে আত্মপ্রত্যয় ও নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সকলকে অনুপ্রাণিত করুক এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার মৈত্রী বন্ধন ও যৌথ প্রচেষ্টার সার্থক স্বাক্ষর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকুক।”

প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো নদীর ওপর নির্মিত এটাই সব চেয়ে বড় স্থাপনা। উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনা ও পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই সেতু ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে (১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগপর্যন্ত) এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে কলকাতার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ ছিল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.