পঞ্চগড়ে স্বল্পব্যয়ে নদীর বুকে ধান চাষ

কাজী হুমায়ুন কবীর মিঠু, পিটিবিনিউজ.কম
সমতলে বোরো চাষে বিঘাপ্রতি খরচ পড়ে অন্তত ১০ হাজার টাকা। কিন্তু নদীর বুকে চাষে খরচ মাত্র দুই হাজার টাকা। তাই পঞ্চগড়ের ভূমিহীনরা শুকনো মৌসুমে নদীর বুকে ধান চাষে ঝুঁকছেন। এর মাধ্যমে নদীতীরের দরিদ্র পরিবারের কয়েক মাসের খাবার জোগান হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া, মহানন্দা, তীরনই, রণচ-ী, গোবরা, বেরং, ভেরসা, ডাহুক, সাও, খড়খড়িয়া, বোরকা, চাওয়াই, তালমা, কুরুম, পাম, সুই, ছোট যমুনা, পাঙ্গা, ছাতনাই, ঘোড়ামারা, বুড়ি তিস্তা, আলাইকুমারী, কুরুন, কালীদহ, রাঙাপানি, ডারা, পাথরাজ, হাতুড়ী, ভুল্লী, পেটকী, টাঙ্গন, নাগর ও রসেয়া নদী। উজানে ভারত একতরফাভবে বাঁধ নির্মাণ করায় শুকনো মৌসুমে এসব নদ-নদীতে চর পড়ে। আর এই সুযোগে তীরবর্তী ভূমিহীনরা চাষাবাদ করে। চুয়ে আসা সামান্য পানিতে তাদের সেচ চলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। নদীতে ধানের সবুজ চারাগাছ বাতাসে দোল খাচ্ছে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজস্ব জমি না থাকায় তারা ফসল চাষাবাদ করতে পারে না। তাই নদীর চরকে ফসল ফলানোর জন্য বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে সেচ দেওয়া পানির চেয়ে নদীর চুয়ে আসা পানি বোরো চাষে অনেক বেশি উপকারী। এতে সার ও সেচসহ সব কিছুতে সাশ্রয় হয়। বিশেষত ভূমিহীন চাষিরা ১০-১২ বছর ধরে এই চরে বোরো ধান চাষ করছে। নভেম্বর থেকে পানি কমে গেলে চরের জায়গা দখলে নিয়ে চাষের উপযোগী করে তোলার জন্য কাজে নেমে পড়ে। মাস দুয়েক পরিশ্রম করে বেদা ও কোদাল দিয়ে আইল বেঁধে পানি আটক করা হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে জমি সমান করার পর ধান রোপণ করা হয়।

চাষিরা জানায়, নদীতে বোরো ধান চাষে বিঘাপ্রতি খরচ হয় প্রায় দু-তিন হাজার টাকা। বিপরীতে এক বিঘা জমিতে ধান আসে ২০ থেকে ২৫ মণ। আগাম ধান লাগানোর কারণে জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহে ফসল ঘরে তুলতে পারে চাষিরা। আর সমতলে বিঘাপ্রতি ১০-১২ হাজার টাকা খরচ করে ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান পাওয়া যায়।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার লাঠুয়াপাড়ার ভূমিহীন হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কোনো জমি-জায়গা নেই। তাই বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চাওয়াই নদীর তিন বিঘার মতো জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। এই ধান থেকেই আমার ছয় সদস্যের পরিবারের কয়েক মাসের খাবারের জোগান হয়।’

আব্দুল জব্বার বলেন, ‘নিজের জমি নেই। তাই নদীতে ধান রোপণ করেছি। বর্ষায় পানির সঙ্গে যে পলি পড়ে, তা আমাদের ধানক্ষেতের সার হিসেবে কাজে লাগে। অতিরিক্ত সার দিতে হয় না। সেচ দেওয়ার ঝামেলাও নেই। তবে জমি তৈরি করতে অনেক কষ্ট হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান পাওয়া যায়।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে ছোট-বড় ৩৩টি নদীর চরে সহ¯্রাধিক চাষি প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছে, যা গত বছর ছিল ১৭০ হেক্টর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক জানান, তীরবর্তী দরিদ্র জনগোষ্ঠী নদীতে বোরো চাষ করছে। আগে এসব চর পতিত থাকত। এখন চাষ করে চাষিদের কয়েক মাসের খাবারের জোগান হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই মৌসুমে কৃষকদের পাশাপাশি নদীতে চাষ করা বোরো সাধারণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, করতোয়া নদীর ৫ কিলোমিটারে খননকাজ চলছে। এছাড়া জেলার ৫ উপজেলার ৫টি নদী খননের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খনন করা হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আরো বৃদ্ধি পাবে। শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় কৃষকরা ধান চাষ করছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*