এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন মনজুরুল আহসান খান

লোভ-লালসা ও ভয়-ভীতির উর্ধ্বে থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তী সময় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করে নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব অকৃত্রিম দেশপ্রেমের পরিচয় দিলেও এখন সেই রাজনীতিই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান নানা ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ জনগণকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলছে। ছাত্র রাজনীতিতেও দেখা মিলছে না মেধাবী শিক্ষার্থীদের। এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ- এক শ্রেণির রাজনীতিকের ক্ষমতার মোহ ও ভোগ-বিলাসের আকাঙ্খা; এক কথায় আদর্শচ্যুতি। এ সুযোগে দ্রুত উত্থান ঘটছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও লুটেরা ধনিক শ্রেণির; আর বেড়ে চলেছে আমলাতন্ত্রসহ অগণতান্ত্রিক শক্তির দৌরাত্ব্য। ফলে ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত প্রিয় মাতৃভূমি গভীর সংকটে নিপতিত। তবে, নৈতিকতার এই অবক্ষয়ের মধ্যেও বহু রাজনীতিবিদ কর্মগুণে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে ক্ষচিত হয়ে আছেন। তাঁদের অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন; বেঁচেও আছেন অনেকে। এসব গুণী রাজনীতিবিদসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিভাবান নাগরিকদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ‘আঁধার রাতের বাতি’ শিরোনামে সাক্ষাতকারভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে পিটিবিনিউজ.কম

মনজুরুল আহসান খান; যাঁকে দেশবাসীর সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে নামের আগে বা পরে কোনো কিছু যুক্ত করতে হয় না। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথের লড়াকু সংগঠন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম সদস্য ও দীর্ঘদিন পালন করেছেন পার্টির সভাপতির দায়িত্ব। প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ৪০০ সদস্যের একটি ইউনিটের কমান্ডার মনজুরুল আহসান খান এক সময় সড়ক পরিবহন শ্রমিক সা¤্রাজ্যেরও মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন। বয়সের ভার ও নানা রোগে অসুস্থ হয়ে বেশির ভাগ সময় বিশ্রামে কাটলেও এখনও সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতাকে পিছনে ফেলে ছুটে আসেন রাজপথে নানা কর্মসূচিতে। কুখ্যাত জামাত নেতা কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সংগঠন গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের শুরুর দিন থেকে তাঁর সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে এর জ্বলন্ত প্রমাণ দেখা গেছে। আগামি ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাতকারে মনজুরুল আহসান খান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাপরবর্তী এ যাবতকালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশের বিদ্যমান অবস্থা ও নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে খোলা-মেলা অনেক কথা বলেছেন। সম্প্রতি রাজধানীর শান্তিনগরের চামেলীবাগে তাঁর নিজ বাসায় সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন পিটিবিনিউজ.কম’র প্রধান সম্পাদক আশীষ কুমার দে।

পিটিবিনিউজ.কম: স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পর একজন মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার অনুভুতি কী?
মনজুরুল আহসান খান: মোটা দাগে বলতে গেলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও দেশে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক মূল্যবোধ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম দেশ স্বাধীন করার জন্যে। একই সঙ্গে এই সশস্ত্র সংগ্রামের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল; তা হচ্ছে মানুষের অথনৈতিক মুক্তি। এ দেশের শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। এককথায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমরা রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু সে লক্ষ্য থেকে দেশ আজ বহুদূরে; বলা যায়, সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে।

পিটিবিনিউজ.কম: এমনটি হওয়ার কারণ কী?
মনজুরুল আহসান খান: অনেক কারণ আছে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্র জঙ্গিবাদের উলঙ্গ উত্থান, রাজনীতিবিদদের পথভ্রষ্টতা, বামপন্থীদের মধ্যে বিভক্তি ইত্যাদি। বলা যায়, এ ক্ষেত্রে আমাদের বামপন্থীদের বিশেষ করে সিপিবি ও ন্যাপের ব্যর্থতাও রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে স্বাধীনতাপরবর্তী সরকারগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখা ও তাদেরকে বাধ্য করার মতো শক্তিশালী ভূমিকা আমরা রাখতে পারিনি।

পিটিবিনিউজ.কম: বঙ্গবন্ধু তো সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে বাকশাল করেছিলেন। আপনারাও সেখানে ছিলেন। তাহলে কেনো….।
মনজুরুল আহসান খান: শুধু সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্যেই বঙ্গবন্ধু বাকশাল করেননি। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর লাগামহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনবিরোধী কর্মকান্ডে দেশের সাধারণ মানুষ অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগও এক প্রকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের অকৃত্রিম সহযোগীতার কারণে বঙ্গবন্ধু তাদের প্রতি অনেকটা আবেগপ্রবণ ছিলেন। এসব কারণে বিশেষ করে তাঁর সরকারের হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার, দেশবাসীর মন থেকে আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির নেতা-কর্মীর অপকর্ম মুছে ফেলতে এবং সর্বোপরী দেশের জনগণের মঙ্গলার্থে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত করে দেশ পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। বাকশাল গঠনের পেছনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো দূরাভিসন্ধি বঙ্গবন্ধুর ছিল না। অকৃত্রিম দেশপ্রেম ও দেশের জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্যই তিনি বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও একদলীয় সরকার ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। মূল লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের মঙ্গল। তবে, তখনকার প্রেক্ষাপটে বাকশাল গঠন করা যথার্থ ছিল না।

পিটিবিনিউজ.কম: তাহলে আপনারা কেনো সেখানে যুক্ত হয়েছিলেন এবং সে সিদ্ধান্ত কী ভুল ছিল?
মনজুরুল আহসান খান: অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা যুক্ত হয়েছিলাম; হতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওই যে আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনবিরোধী কর্মকান্ডে তাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, শুধু আওয়ামী লীগ নামে দল রাখবেন না। সে ক্ষেত্রে সিপিবি ও ন্যাপ সম্মত না হলেও বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করতেন। কিন্তু নাম যাই হোক, বাকশাল গঠনের পর সেই আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়েই তো সরকার পরিচালিত হতো। তারা তো বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে দেশ চালাতে দেননি। একদিকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে তাঁকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছেন। এছাড়া ওই সময় জাসদ ও বামপন্থী নামধারী কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সারা দেশে চরম অরাজকতা সৃষ্টি করে চলেছিল। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অপশক্তিগুলোর তৎপরতা তো ছিলোই। সব মিলিয়ে দেশ ছিল টালমাটাল। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রীক ষড়যন্ত্রও অব্যাহত ছিলো। বহুমুখী ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো। বলা যায়, দেশে তখন বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট ছিলো না এবং বাকশালে যুক্ত হওয়াটাও ছিলো আমাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা বা ভুল।

পিটিবিনিউজ.কম: একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ হয়ে সেনাবাহিনী যুদ্ধ করছিলো। এছাড়া বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়। তাহলে আপনারা কেনো পৃথক গেরিলা বাহিনী গড়ে তুললেন?
মনজুরুল আহসান খান: সে এক বড় ইতিহাস, করুণ কাহিনী।

পিটিবিনিউজ.কম: বলবেন সে কাহিনী?
মনজুরুল আহসান খান: নিশ্চয়ই বলবো। ২৫ মার্চ গভীররাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পরেরদিন ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হলো। তাঁর (বঙ্গবন্ধু) ওই ঘোষণা রেকর্ড করা হয়েছিলো গ্রেপ্তারের আগেই। এই ঘোষণার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ও ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত দেশপ্রেমিক বাঙালি সেনাসদস্যরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মূলত আগে থেকেই তাঁদেরকে সংগঠিত করা হয়েছিলো। আর এ কাজটি করেছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এম এ জি ওসমানী। এছাড়া আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে প্রত্যেক বিভাগ, জেলা ও মহাকুমায় গঠিত সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে আলাদা মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমরাও তাতে যোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সেখানে নেওয়া হয়নি। অনেক জায়গায় আমাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অথচ পার্টির সিদ্ধান্তে অনেক আগে থেকেই ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। আওয়ামী লীগের এই আচরণে আমরা চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ হই। আমরা জানতে পারি, ভারতে আশ্রয় নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বেরই একটি অংশ সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতায় নেমে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন তাঁরা। তাঁকে হত্যার পরিকল্পনাও করা হয়। তাজউদ্দীনকে হত্যার জন্য বেছে নেওয়া দিনটি ছিলো সম্ভবত ২১ সেপ্টেম্বর। জেনারেল ওসমানীর নির্দেশনা ও পরিচালনায় বাংলাদেশে সেনাসদস্যরা যখন বিভিন্ন সেক্টরে বীরোচিত লড়াইয়ে লিপ্ত, বিভিন্ন পর্যায়ের বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তুমুল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একাংশের ষড়যন্ত্রের কারণে মাঝপথে মুক্তিযুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতেই ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় গড়ে তোলা হয় বিশেষ গেরিলা বাহিনী।

পিটিবিনিউজ.কম: আওয়ামী লীগের কোন নেতারা সেদিন দেশবিরোধী এই কাজে লিপ্ত ছিলেন?
মনজুরুল আহসান খান: খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাহেরউদ্দীন ঠাকুর, মাহাবুবুল আলম চাষীসহ অনেকেই ছিলেন। মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের অনুচর এসব বর্ণচোরা আওয়ামী লীগ নেতা মূলত পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। তাঁরা আমেরিকার পরামর্শে ও মধ্যস্থতায় মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দূরদর্শীতা, নির্ভেজাল দেশপ্রেম ও কঠোর মনোবল, সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার পক্ষে সিপিবি-ন্যাপের শক্ত অবস্থান এবং সর্বোপরী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধীরা গান্ধীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সে দেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর প্রতি মমত্ববোধের কারণে কুচক্রীমহলের সকল ষড়যন্ত্র সেদিন ব্যর্থ হয়। এসব নানা কারণে আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করি।

পিটিবিনিউজ.কম: এতে কী সুফল পেয়েছেন আপনারা?
মনজুরুল আহসান খান: বলা যায়, আমাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের গতি ফিরে আসে।

পিটিবিনিউজ.কম: যেমন…
মনজুরুল আহসান খান: ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয় গেরিলা বাহিনী গঠনের পাশাপাশি আমরা বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন আদায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতায় নেমে পড়ি। তখন এই গেরিলা বাহিনীর তিনজন প্রধান ছিলেন- সিপিবি সভাপতি কমরেড মণি সিংহ, ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ও ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ (বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী)। এই তিনজন ও আরেক প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড খোকা রায়সহ বামপন্থীদের তৎপরতা এবং ইন্ধিরা গান্ধীর বিচক্ষণতায় বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে আসে। মজার কাহিনী হচ্ছে- গেরিলা বাহিনী ভারতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ নিতে থাকলেও প্রথমদিকে ভারত সরকার তেমন সহায়তা করেনি। একইভাবে সেক্টর কমান্ডারদের ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদেরও সহায়তা সংকুচিত করে আনে ভারত। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি অংশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতায়ও এর একটি কারণ ছিল। সে সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিআই) বামপন্থী কিছুদল নিজেদের উদ্যোগে সাধ্যমতো সহায়তা দিয়েছে আমাদের। তবে প্রায় এক কোটি শরণার্থী নিয়ে বিপাকে পড়ে ভারত। ইন্ধিরা গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে চাচ্ছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। কারণ, তখনকার নজিরবিহীন গণহত্যায় তাঁর বিবেক দংশিত হয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ দুই শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকায় তিনি বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তবে এই সংকট তখন কেটে যায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব নিশ্চিত হয় যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের সব বামপন্থী দল একমত হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বিচার গণহত্যায় ভারতের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস বিশেষ করে দেশটির সরকারপ্রধান ইন্ধিরা গান্ধী নিজেও মর্মাহত হয়ে মানবিক কারণে এক কোটি মানুষকে নিজ দেশে ঠাঁই দিয়েছেন। এই অবস্থায় তখন মুক্তিযুদ্ধে সকল প্রকার সহযোগীতা প্রদানের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই গেরিলা বাহিনীর ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করে সন্তুষ্ট হন এবং আমাদের অস্ত্র সরবরাহের নির্দেশ দেন। তখন আমরা ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলারা সশস্ত্র হয়ে বিভিন্ন সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকি। দ্রুত বাড়তে থাকে গেরিলা বাহিনীর বহর। এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু বামপন্থীদের এই অবদান ও ত্যাগের কথা অনেকেই বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে চায় না। এটা অত্যন্ত দু:খজনক। যদিও বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনসহ জাতীয় অনেক নেতা তা অবলীলায় স্বীকার করে গেছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে বামপন্থীদের দমিয়ে রাখতে চাইতেন বঙ্গবন্ধু। সেটা তাঁর দোষ ছিলো না; মোশতাকসহ তাঁর আশেপাশের কিছু কুচক্রী তাঁকে বিভ্রান্ত করতে আমাদের সম্পর্কে অনেক কূপরামর্শ দিতেন। আর এদের পরামর্শেই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সহযোদ্ধা তাজউদ্দীনের মতো দেশপ্রেমিক বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শেষদিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু; পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের পর তা প্রমাণিত হয়েছে।

পিটিবিনিউজ.কম: জাসদ সম্পর্কে কিছু বলুন।
মনজুরুল আহসান খান: কি আর বলবো। তাদের রাজনীতি তো দেশবাসী দেখে আসছে। তবে জাসদের রাজনীতি হঠকারী ও ভুল থাকলেও পাকিস্তানবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে দলটির অনেক নেতার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে এবং কিছু নেতার উচ্চাভিলাসের কারণে প্রত্যক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধাচরণ করে জাসদ গঠন করা হলেও দলের সব নেতা কিন্তু চক্রান্তের সঙ্গে ছিলেন না; অনেকে না বুঝে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, অনেককে বিভ্রান্ত করেছেন অন্যরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সমাজতন্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব হাজির করে জাসদ গঠন, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠনের লক্ষ্যে গণবাহিনী গঠন, সেনাবাহিনীর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার- সবই ছিলো হঠকারী সিদ্ধান্ত; যা একটি সদ্যস্বাধীন দেশকে অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। তবে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে জাসদ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসলেও ততোদিনে সাংগঠনিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। অতীতে গণবিরোধী কর্মকান্ড ও বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্বের কোন্দলে বারবার ব্রাকেটবন্দি হওয়ার কারণে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়নি দলটি। তবে এতো কিছুর পরও বলবো, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে এবং এর আগে জাসদের (তৎকালীন মুজিববাদী ছাত্রলীগ) অনেক নেতাকর্মীর বীরোচিত অবদান অনস্বীকার্য। দলটি কয়েকটি ক্ষুদ্রাংশে পরিণত হয়ে পড়লেও (দুটি ছাড়া বাকিগুলো নামসর্বস্ব) নেতৃত্বের কোন্দলে সর্বশেষ খন্ডিত দুটি অংশই মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করে চলেছে।

পিটিবিনিউজ.কম: জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কিছু বলুন।
মনজুরুল আহসান খান: সব চেয়ে বড় কথা তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা; একজন সেক্টর কমান্ডার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে সূচনালগ্নে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এদিন তিনি নিজহাতে গুলি করে একসঙ্গে ছয়জন পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে খতম করেন; যার মধ্যে দু’জন অফিসার ছিলেন। প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও পরবর্তী সময় জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দীর্ঘ ৯ মাস সাহসের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে বাঙালি সেনাসদস্যসহ জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। একজন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে যুবতী স্ত্রী ও সন্তানকে মৃত্যুমুখে ফেলে রেখে এভাবে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা সত্যিকার অর্থে কেবল একজন দেশপ্রেমিকের পক্ষেই সম্ভব। সুতরাং মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার বীরোচিত অবদান ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বিএনপি আজ জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করলেও সেদিন তিনি ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে। সেই সত্য ভুলে যায় বিএনপি। এছাড়া পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টপরবর্তী নানা ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসের কারণে তখনকার টালমাটাল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিলেন জিয়া। পর্যায়ক্রমে সেনাপ্রধান, উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সামরিক আইন প্রশাসক ও সবশেষে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর অনেক কর্মকান্ড নিয়ে যথেষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। এছাড়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রচলন, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামাতে ইসলামীসহ মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারী ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনের মতো অনেক অপকর্ম করেছেন তিনি।

পিটিবিনিউজ.কম: দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
মনজুরুল আহসান খান: বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন মহাজোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বড় শক্তি হলেও তার দোসর হিসেবে আছে সেনা ছাউনিতে গড়ে ওঠা জাতীয় পার্টি। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সামরিক-স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ; যিনি মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার ওপর আঘাত করে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ যুক্ত করেছেন। এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনে গোটা দেশ ও জাতি জগদ্দল পাথরের নিচে পিষ্ট হয়েছে। রাজপথে শহীদ হয়েছেন বহু মানুষ। মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মজ্ঞুর হত্যার প্রধান আসামী তিনি। রাজনৈতিকভাবে পতিত সেই এরশাদকে ক্ষমতার ভাগীদার করে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষা করা যায় না; ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াই জোরদার হয় না। কারণ, মহাজোটের শরিক হয়েও এরশাদ যান চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামীর আমির আল্লামা শফির কাছে। অথচ নারীবিদ্ধেষী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এই হেফাজতের তান্ডবে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তুপে। জামাতের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় হেফাজতকর্মীদের হিং¯্রতায় সারা দেশে জ্বলে উঠেছিল সহিংসতার আগুন। এছাড়া খোদ আওয়ামী লীগের মধ্যেও ধর্মীয় মৌলবাদের ছোঁয়া রয়েছে। দলটির একাধিক সাংসদ ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে হাটহাজারী মাদ্রাসাসহ এ জাতীয় অনেক ধর্মীয় স্থাপনায় যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহকে যেমন শক্ত হাতে দমন করা যাচ্ছে না, তেমনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষা পাচ্ছে না। দেশ ক্রমেই হয়ে উঠছে অস্থিতিশীল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.