বিশ্ব শ্রবণ দিবস: মনিলাল আইচ লিটু

অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু। ফাইল ছবি

অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু

মানুষের জন্য শ্রবণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনক্ষমতা, যার মাধ্যমে আমরা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি। শ্রবণক্ষীণতা ও বধিরতা মানুষকে সমাজে অগ্রহণযোগ্য করে ফেলে। শিশুর ভাষা শিক্ষা, লেখাপড়া ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য স্বাভাবিক শ্রবণ শক্তি অপরিহার্য।

শ্রবণজনিত সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব শ্রবণ দিবস-২০১৮ এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘ভবিষ্যতকে শুনুন, সচেতন হউন’।

বধিরতার কারণে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোমাত্রার শ্রবণসমস্যায় ভুগছেন। ৯ দশমিক ছয় শতাংশ মানুষ প্রায় শ্রবণ প্রতিবন্ধী; তাদের দুই কানেই সমস্যা। এক দশমিক দুই শতাংশ মানুষ তীব্র বধিরতায় এবং সমসংখ্যক (এক দশমিক দুই শতাংশ) মানুষ মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধিরতায় আক্রান্ত।

বধিরতাসমস্যা মূলত হয় জন্মগত কারণে বা পরবর্তিতে বিভিন্ন রোগ বা সমস্যার কারণে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মধ্যকর্ণের প্রদাহ, আঘাতজনিত সমস্যা, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে সৃষ্ট বধিরতা, শব্দদূষণ, যার মধ্যে রয়েছে- উচ্চমাত্রার শব্দে হেডফোন দিয়ে গান শোনা, উচ্চমাত্রার হর্ণ বাজানো, লাউডস্পিকারের শব্দ, কলকারখানার শব্দ ইত্যাদি। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে- তারা কানে ঠিক মতো শোনে কি না? যদি শিশুদের শ্রবণজনিত সমস্যা অথবা কথা শিখতে দেরি হওয়ার মতো কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আর বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে শ্রবণক্ষীণতা দেখা দিলে প্রয়োজনে অপারেশন করা, শ্রবণযন্ত্র অথবা উভয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হবে।

কানের যত্নে যা করণীয়:-
১। কানে কোন কিছুই ঢোকানো যাবে না। এমন কি কান পরিষ্কার করার জন্য কাঠি, মুরগীর পালক বা কটন বাড ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
২। খৈল জমে কান বন্ধ-ভাব হলে বা কানের মধ্যে বাইরের কোনো বস্তু প্রবেশ করলে অপসারণ করতে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হোন।
৩। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কানে তেল বা অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।
৪। কানে যাতে পানি না যায়, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।
৫। আঘাতজনিত বা মধ্যকর্ণের প্রদাহ বা অন্য কারণে কানের সমস্যা মনে হলে অবহেলা না করে যতো দ্রুত সম্ভব নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।
৬। যত্রতত্র হর্ণ বাজানো, লাউডস্পিকারে শব্দ, হেডফোন ব্যবহার ও কলকারখানার শব্দ সহনীয় মাত্রায় রাখতে হবে।
৭। শিশুদের টনসিল/এডেনইড/সাইনাসের প্রদাহ এবং নাক ও গলার এলার্জির চিকিৎসা করানো।
৮। শ্রবণমাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করানো।

বধিরতা সমস্যা সমাধানে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। বর্তমানে জন্মগতভাবে বধির শিশু ও বড়দের শ্রবণজনিত সমস্যার অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সীমিত পরিসরে বাংলাদেশে রয়েছে। তবে এসব জটিল চিকিৎসা ও অপারেশনের জন্য অত্যন্ত উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন, যা আমাদের দেশে অপ্রতুল। সুতরাং বধিরতা প্রতিরোধে ও নিরাময়ে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সার্জারি, শ্রবণযন্ত্র, ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টসহ অন্যান্য অত্যাধুনিক চিকিৎসাসামগ্রি সহজলভ্য করে তোলা প্রয়োজন এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ ও মানসম্পন্ন চিকিৎসক গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ দেশের মানুষ অত্যাধুনিক চিকিৎসার দ্বারা উপকৃত হবে।

অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটু: বিভাগীয় প্রধান, নাক, কান ও গলা বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা। সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব অটোল্যারিংগোলজি এন্ড হেড-নেক সার্জনস।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.