সাঁওতালদের জীবনযাত্রা এখনো স্বাভাবিক হয়নি

সৌজন্য-পাঠকের কণ্ঠ

0
Arson attack on Santal community at Govindaganj in Gaibandha

এখনো স্বাভাবিকতা ফেরেনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাঁওতালদের জীবনযাত্রায়। আতঙ্কও বিরাজ করছে তাঁদের মধ্যে। তারপারো ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও বাপ-দাদার জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে অনড় সাঁওতালরা। দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁরা বলছেন, জীবন দিবো তবুও বাপ-দাদার জমি কিছুতেই ছাড়বো না। বাপ- দাদার জমিতে বসতি করে কষ্ট হলেও শান্তিতে থাকতে চাই। ৬ জানুয়ারি গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকলকর্মী ও পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ, তাদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার দুই মাস পূর্ণ হয়। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে ত্রিমুখী সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে তিরবিদ্ধ হয় ৯জন এবং গুলিবিদ্ধ হয় চারজন। এ ঘটনায় তিনজন সাঁওতাল নিহত হয়। দুই মাস পূর্ণ হলেও সেই মর্মান্তিক ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সাঁওতালরা। হামলার স্মৃতি এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঘটনার পর মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেয় ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ শতাধিক সাঁওতাল পরিবার।

বিচারিক হাকিম ও পিবিআইয়ের তদন্ত শুরু
গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকলের ইক্ষু খামারের বিরোধপূর্ণ জমি থেকে সাঁওতাল বসতি উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ, হামলা, লুটপাট ও হত্যা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বিচার বিভাগ ও পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. শহিদুল্লাহ ৩ জানুয়ারি বেলা ১১টার দিকে সাঁওতাল অধ্যুষিত মাদারপুর গ্রামে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম ময়নুল হাসান ইউসুফ। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পিবিআই’র বগুড়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে পৌঁছায়। তদন্তকারীদের দল দুটি আলাদাভাবে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল ও বাঙালি পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। আগুনে পোড়া ঘরের কিছু আলামতও তাঁরা সংগ্রহ করেন। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ মুখ্য বিচারিক হাকিম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে জানান। আকতার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ওই ঘটনায় স্বপন মুরমু ও টমাস হেমব্রমের করা মামলার তদন্ত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁরা এসেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। মুখ্য বিচারিক হাকিম শহিদুল্লাহ জানান, সেদিনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল ও বাঙালিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করেছেন তিনি। তদন্ত শেষে তিনি উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন পাঠাবেন।

এদিকে তদন্ত দল আসার খবরে অধিগ্রহণ করা জমি ফেরত ও দোষীদের বিচারের দাবিতে তীর ধনুক, লাঠিসোঁটা নিয়ে মাদারপুর গ্রামে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ক্ষতিগ্রস্তরা। তদন্তের অংশ হিসেবে ৬ জানুয়ারি শহিদুল্লাহ উপজেলার মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামে যান। সাঁওতালরা এখনো আতঙ্কে আছে জানিয়ে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমিন বাস্কে বলেন, এখনো আমাদের লোকজন বাজারে যেতে ভয় পাচ্ছে। বাজারে অপরিচিত লোকজন নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার বলেন, সাঁওতাল-অধ্যুষিত ওই দুই গ্রামের পরিস্থিতি এখন ভালো। তাদের নিরাপত্তায় সাহেবগঞ্জ খামার এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

ফাইল ছবি।

বিনোদনের আয়োজন
সাঁওতাল পল্লীতে তা-ব-হামলার দুই মাস পূর্তিতে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশু-কিশোরদের নিয়ে বিনোদনের আয়োজন করা হয়। গত ৬ নভেম্বরের ঘটনা ভুলাতে বগুড়া থেকে আসা কিশোর ডালিম মিয়া ও তাঁর ১০ বন্ধুদের ব্যতিক্রম উদ্যোগে এসব বিনোদনের আয়োজন করা হয়। এদিন, শুক্রবার সকাল থেকে দিনভর মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর একটি মাঠে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা হয়। দিনভর খেলাধুলার মধ্যে ছিলো- দৌড় প্রতিযোগীতা, ব্যাঙ দৌড়, বিস্কুট দৌড়, মোরগ যুদ্ধ। এছাড়া, ছবি আঁকা, তির ছোড়া প্রতিযোগিতা ও নাচগান অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিজয়ী ৫০ শিশুকে পুরস্কার হিসেবে বিভিন্ন সামগ্রীসহ গল্পের বই তুলে দেয়া হয়। প্রতিযোগিতায় শতাধিক শিশু-কিশোর অংশ নেয়। সাঁওতালপল্লীতে আশ্রয় নেওয়া নারী-পুরুষ এ আয়োজন উপভোগ করেন। এসব বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ ও অংশ নিয়ে শিশুর-কিশোররা বিনোদিত হয়।

সেই ৬ নভেম্বর
১৯৬২ সালে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রামের এক হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তুলেছিলো। ওই জমি ইজারা দিয়ে ধান ও তামাক চাষ করে অধিগ্রহণের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে তার দখল ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে সাঁওতালরা। পরে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে বিরোধপূর্ণ চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে কয়েকশ’ ঘর তুলে বসবাস শুরু করে তাঁরা। ৬ নভেম্বর চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষের সময় সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। ওই ঘটনায় নিহত হন তিন সাঁওতাল, আহত হন অনেকে।

মামলার পরিস্থিতি
সংঘর্ষ-হামলার ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঘটনার দিন রাতেই পুলিশ সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলা করে। এ মামলায় চারজন সাঁওতালকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তাঁরা জামিন পান। গত ১৬ নভেম্বর ৬০০ জনকে আসামি করে স্বপন মুরমু নামের এক ব্যক্তির করা মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর ২৬ নভেম্বর স্থানীয় সাংসদ ও ইউপি চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করে টমাস হেমব্রম নামের আরেক ব্যক্তি ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে ও ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা দেখিয়ে যে মামলা করেন, তাতে এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। গোবিন্দগঞ্জ থানায় স্বপন মুরমু ও থোমাস হেমরমের করা মামলা পিবিআইয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্তে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শককে পদক্ষেপ নিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।

সম্পাদনা: রাজু আহমেদ।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page