রহস্য ঘেরা সাংসদ লিটন হত্যাকাণ্ড

রাজু আহমেদ। নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0
সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। ফাইল ছবি।

জামাতকে দায়ী করলেন প্রধানমন্ত্রী
একই অভিযোগদলের একাধিক নেতারও
জিজ্ঞাসাবাদে স্বজন-স্থানীয়দের দেয়া তথ্যে গরমিল
ডিএনএ টেস্টে টুপি
লিটনের পরিবারকে নিরাপত্তা
সাংসদদের নিরাপত্তা দাবি

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ মনজুরুল ইসলাম (লিটন) হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা জামাতে ইসলামীকে সন্দেহ করছেন। তবে লিটনের বোনেরা তদন্তে সব বিষয়কেই মাথায় রাখতে বলছেন। বোন তৌহিদা বুলবুল ও ফাহমিদা বুলবুল কাকলী কোনো কিছু স্পষ্ট না করেই সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, শুধু জামাতকে ঘিরে যেনো হত্যা মামলার তদন্ত আটকে না থাকে। এর আগে লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জামাতই তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছে বলে তাঁর ধারণা। আওয়ামী লীগের নেতারাও সেই সন্দেহের কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন। তবে জামাত এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে তাদের উপর দোষ চাপানো হচ্ছে। এদিকে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে স্বজন ও স্থানীয়দের দেয়ার বিবরণে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনকি হত্যার আগের দিন থেকে হত্যার দিন পর্যন্ত যাঁরা সাংসদের সঙ্গে দেখা করেছেন, তাঁদের সম্পর্কেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সব ঘটনা, কাকতাল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

২০১৬ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ এলাকায় নিজ বাড়িতে সাংসদ লিটনকে গুলি করে পালিয়ে যায় অজ্ঞাতনামা দুর্বত্তরা। আহত অবস্থায় দ্রুত উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সাংসদ নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও তাঁর সমর্থকেরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে মিছিল বের করেন, সড়ক অবরোধসহ এক জামাত সমর্থকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এছাড়া হরতালও পালন করেন। সাংসদ লিটনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজসহ বিশিষ্টজনেরা গভীর শোক প্রকাশ করেন। শোক বার্তায় তাঁরা সাংসদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পরে রংপুর পুলিশ লাইন মাঠে, ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এবং গাইবান্ধায় গ্রামের বাড়িতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে বাবা-মায়ের কবরের পাশে সাংসদ লিটনকে দাফন করা হয়।

প্রসঙ্গত, সুন্দরগঞ্জের শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার মামলার আসামি ছিলেন সাংসদ মনজুরুল। তিনি জামিনে ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিটনের বোন বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। জড়িত সন্দেহে আটক ৩৯ জনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২১ জনকে বিভিন্ন মামলা ও ৫৪ ধারায় আদালতে হাজির করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

যেভাবে হত্যা
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাংসদের শ্যালক বেদারুল আহসান বলেন, সাংসদ চা খেয়ে বাসার ড্রয়িংরুমের সোফায় একা বসে ছিলেন। মাগরিবের আজানের সময় কালো রঙের দুটি টিভিএস মোটরসাইকেলে চারজন লোক এসে বাসার সামনে মোটরসাইকেল রাখে। তাদের মুখ মাফলার প্যাঁচানো ছিলো। তাঁরা সাংসদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। সাংসদ ড্রয়িংরুমে (বসার ঘরে) আছে, এ কথা বলার পরে ওই চারজন সেখানে যায়। আমি বাসার অন্য একটি রুমে আমার বোনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। দুই মিনিটের মধ্যে গুলির শব্দ পাই। বেদারুল আহসান বলেন, সাংসদ চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমাকে গুলি করেছে, আমাকে বাঁচা, ওদেরকে ধর। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি, সাংসদ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে আর দুর্বৃত্তরা দ্রুত গুলি করতে করতে বাসা থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে পালিয়ে যায়। সাংসদকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. নারায়ণ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল ১ জানুয়ারি লিটনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। পরে ডা. সাহা সাংবাদিকদের বলেন, সাংসদকে পাঁচটি গুলি করা হয়েছে। দুটি গুলি বুকে ও তিনটি গুলি লাগে বাঁ হাতের তালুতে। কিডনী ও শ্বাসযন্ত্রে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের পর লিটনের মরদেহ রংপুর পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনার পর বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে মরদেহ রাখা হয়। এরপর ২ জানুয়ারি সকাল ১০টার পরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তাঁর মরদেহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠনও শ্রদ্ধা জানায়। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে মরদেহ সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গায় নিয়ে আসা হয়। পরে সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহবাজ মাস্টারপাড়া গ্রামে বাসভবনে তাঁর মরদেহ রাখা হয় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। বাড়ির সামনের মাঠে এদিন বাদ আসর নামাজে জানাজা শেষে বাবা-মায়ের কবরের পাশে লিটনকে দাফন করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে স্থানীয় নেতৃবৃন্দরাও উপস্থিত ছিলেন।

২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাংসদ লিটনের দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। ছবি: নাছির উদ্দিন।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ মনজুরুল ইসলামের (লিটন) মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: নাছির উদ্দিন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৬ জানুয়ারি জুম্মার নামাজের পর সুন্দরগঞ্জের সকল মসজিদে লিটনের রূহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত এবং মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামে লিটনের বিশাল বাড়িতে এখন শুধু তাঁর চাচি শিমু, মামাতো বোন স্মৃতি এবং কেয়ারটেকাররা ছাড়া আর কেউ নেই। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে একসময়ের সরগরম বাড়িতে আজ কথা বলারও যেনো কেউ নেই। কখনো কখনো নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে লিটনের কবর জিয়ারত করছেন এবং ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

বাড়ির লোকজন জানান, লিটনের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর অতি প্রিয় দুটি বিদেশি অ্যালসেশিয়ান কুকুর শুয়ে আছে কবরের পাশে। কেউ ওদের কিছুই খাওয়াতে পারছে না। লিটন তাদের নাম রেখেছিলেন টাইগার ও কালু। নিজেই ওদের খাবার দিতেন এবং পরিচর্যা করতেন।

এটা কাকতালীয় ঘটনা: লিটনপত্নী
সাংসদের স্ত্রী খুরশীদ জাহান স্মৃতি ৩ জানুয়ারি বলেন, আসলে এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা। তিনদিন থেকে ছাত্রলীগের ছেলেরা একটা মামলার কারণে ধাওয়ার মধ্যে ছিলো। ওরা আসতো না। দিনে যতো লোকই আসুক, সন্ধ্যা বেলাটা আমরা বামনডাঙ্গায় অফিসে যাই। এ কারণে সন্ধ্যায় লোক কম থাকতো। এ হামলার সঙ্গে বাসার কোনো লোক যুক্ত থেকে ভেতর থেকে খবর দিয়েছে, এ রকম ভাবেন কি না-জানতে চাইলে স্মৃতি বলেন, আমার এ রকম মনে হয় না। তাহলে এ সময়টা সাংসদ একা থাকেন বা থাকবেন, এ তথ্য হত্যাকারীরা জানলো কীভাবে? তিনি বলেন, সেটা আমিও ভাবছি।

লিটনের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি
লিটনের হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৬ জানুয়ারি বিকালে কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের ধুবনীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। এতে বক্তারা লিটনের হত্যাকারী হিসাবে জামাত-শিবিরকে দায়ী করে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

লিটন হত্যায় জামাতকে দায়ী করছেন প্রধানমন্ত্রীও
দলীয় সাংসদ লিটন হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি জামাতে ইসলামীকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৪ জানুয়ারি গণভবনে দলের এক সভায় বক্তব্যে উত্তরাঞ্চলের জেলাটিতে জামাতের তৎপরতা ঠেকাতে লিটনের সক্রিয়তা তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, লিটন জামাতের বিরুদ্ধে সবসময় ছিলো। এমনকি গোলাম আযম ওখানে মিটিং করতে চেয়েছিলো, সেই মিটিং ও (লিটন) করতে দেয়নি, বাধা দিয়েছিলো। সেই থেকে জামাতের একটা ক্ষোভ তাঁর ওপর ছিলো। ওকে বেশ কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আর অবশেষে তাঁরা সেই হত্যাকা-টা ঘটালো। লিটন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, ‘যেভাবেই হোক তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার’ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

লিটনের বোনেরা সব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের আহ্বান জানালেও তাঁর স্ত্রী গাইবান্ধা মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী স্মৃতি জামাতকেই দায়ী করেছেন। তিনি ৩ জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯৮ সালে সুন্দরগঞ্জে গোলাম আযমকে নিয়ে জামাতের এক সমাবেশ পণ্ড করে দিয়েছিলেন লিটন। তাঁর জের ধরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। সে সময় তাঁর (লিটনের) গুলিতে আহত জামাতের ফতেখাঁ গ্রামের ক্যাডার হেফজসহ আরো দুর্ধর্ষ জামাত ক্যাডাররা লিটনকে মুঠোফোনে মেসেজ পাঠিয়ে এবং ফোন করে দীর্ঘদিন থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলো।

১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডিস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকমন্ডলীর সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সাংসদ লিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রতিয়মান হয়েছে, এটা ধর্মীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাপুরুষোচিত কাজ। মৌলবাদী অপশক্তিকে এই কৃত অপরাধের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

একই দিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিটনের মরদেহ দেখার পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য স্বাধীনতা পক্ষের শক্তিকে দুর্বল করতে জামাত-শিবির লিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। নানক বলেন, লিটন তাঁর এলাকায় স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবির অপশক্তির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছিলো। তিনি বলেন, লিটন শক্তহাতে জামাত-শিবিরকে দমন করেছিলো। ফলে এলাকায় তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠে। সেই কারণে বিগত জাতীয় নির্বাচনে তিনি এলাকায় সাংসদ নির্বাচিত হন।

সাংসদ হত্যার বিচার হবেই
লিটন হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে আইন-শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন সাংসদকে হত্যা কখনো মেনে নেওয়া যায় না। যারাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, যেভাবেই হোক তাদের খুঁজে বের করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। তাদের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে। এদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। ৪ জানুয়ারি গণভবন থেকে রংপুর বিভাগের আট জেলার জনগণের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময়ের সময় সরকারপ্রধান এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা।

সবদিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চলছে
সাংসদ লিটন হত্যার ঘটনায় জামাত সংশ্লিষ্টতার কথা উঠলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সবদিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত স্বজনসহ অন্যরা একেকজন একেকরকম তথ্য দিলেও পুলিশ শিগগিরই খুনিদের শনাক্ত করার ব্যাপারে আশাবাদী। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানাতে চান না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এই হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম বলেন, খুব শিগগিরই খুনিদের শনাক্ত করতে পারবেন বলে তাঁরা আশাবাদী। সবদিক বিবেচনায় এনে তাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি বলা যাবে না।

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, যেখানেই সন্দেহ হচ্ছে সেখানেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যদি কিছু পাই আপনারা জানতে পারবেন। তবে বলার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। তদন্ত চলছে।

সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। ফাইল ছবি।

ডিএনএ টেস্টে টুপি, জিজ্ঞাসাবাদে ছাত্রলীগ নেতা
তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, হত্যার দিন লিটনের বাড়ির সামনে গাব গাছের দক্ষিণ দিকে একটি কালো রংয়ের ক্যাপ উদ্ধার করেছে পুলিশ। হামলাকারীদের মধ্যে যে দুই জন ঘরে ঢোকে তাদের গায়ে ছিলো কালো রংয়ের জ্যাকেট এবং পরনে ছিলো কালো প্যান্ট আর মাথায় কালো রংয়ের ক্যাপ। ধারণা করা হচ্ছে, গুলি চালিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার সময় ঘাতকদের কারো মাথা থেকে ক্যাপটি পড়ে যায়। ক্যাপটির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকৃত খুনিকে শনাক্ত করতে তদন্তে সহায়ক সূত্র হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা সুন্দরগঞ্জ পৌর মেয়র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ৫ জানুয়ারি দুপুরে উপজেলার বাহিরগোলা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম রানাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি টিম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে। তবে এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেও তাঁরা এর উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।

জিজ্ঞাসাবাদে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য
এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে স্বজন ও স্থানীয়দের দেয়ার বিবরণে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। লিটনের শ্যালক বেদারুল আহসান বেতার বলছেন, সাংসদ লিটন বৈঠকখানায় বসেছিলেন। এ সময় তিনি ও লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতিও ওই ঘরে ছিলেন। দুই জন যুবক ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বের হয়ে যান। খুনিদের মুখ মাফলার দিয়ে ঢাকা ছিলো।

খুরশিদ জাহান স্মৃতি বলেন, তাঁরা ভিতর বাড়ির উঠানে রান্নাঘরের কাছে ছিলেন। তিনি হামলাকারীদের মুখে মাফলার বা টুপি দেখেননি। তবে দুইজনেরই দাবি, গুলির শব্দ শুনে তাঁরা ছুটে এসেছিলেন। তাদের লক্ষ্য করে খুনিরা গুলি করেছিলো হামলাকারীরা। তাদের গৃহকর্মী ইউসুফ বলছেন, গুলির শব্দ শুনে তিনি ও বেতার ঘর থেকে বের হয়ে আসেন।

মাঠে ক্রিকেট খেলা কয়েজন শিশু-কিশোর বলে, হামলাকারীদের কারোরই মুখ ঢাকা ছিলো না, একজনের হাতে একটি মাংকি টুপি ছিলো। খুনিরা বিকাল থেকে আশপাশের এলাকাতেই ঘোরাফেরা করছিলো। লিটন মাঠে বসে তাদের ক্রিকেট খেলা দেখার সময় দুইজন খুনি তাঁর কাছে যায় এবং জরুরি কথা আছে বলে তাঁকে বৈঠকখানায় ডেকে নিয়ে যায়।

লিটনের পরিবারকে নিরাপত্তা
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) আশরাফুল ইসলাম জানান, লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি এবং তাঁর একমাত্র সন্তান রাতিন লিটনের বোনদের সঙ্গে এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। রাতিন ঢাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ও লেভেলের শিক্ষার্থী। তার স্কুলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে লিটনের স্ত্রী গাইবান্ধার পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবহতি করেন। পরে ঢাকায় তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাংসদদের নিরাপত্তা দাবি
সব সাংসদদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। সংসদ ভবনে লিটনের জানাজা শেষে একই জেলার আরেক আসনের এই সাংসদ সাংবাদিকদের একথা জানান।

সাংসদদের নিরাপত্তায় গানম্যানের ব্যবস্থা করা হবে কি না এই প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, জনপ্রতিনিধিদের তাদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে হয়। বিভিন্নভাবে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হয়। এজন্য জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত, গত এক যুগের মধ্যে এই প্রথম কোনো সাংসদ হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। এর আগে ২০০৫ ও ২০০৪ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগেরই দুই সাংসদ শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও আহসানউল্লাহ মাস্টার।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page