যুদ্ধাপরাধ: গাইবান্ধার আজিজসহ ছয়জনের রায় যেকোনো দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0
আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ মিয়া। ফাইল ছবি।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের (যুদ্ধাপরাধ) মামলায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামাত নেতা আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ (ঘোড়ামারা আজিজ) সহ ছয় আসামির রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে। এই ছয় আসামির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, আটক, অপহরণ, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের তিনটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আজ সোমবার বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি আমির হোসেন ও আবু আহমেদ জমাদারও। ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর এটি হবে ২৯তম রায়।

আজিজ ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মো. আব্দুর রহিম মিঞা, মো. রুহুল আমিন মঞ্জু, মো. আব্দুল লতিফ, আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী এবং মো. নাজমুল হুদা। মামলার ছয় আসামিদের মধ্যে মো. আব্দুল লতিফ কারাগারে আছেন। এছাড়া বাকি পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন।

শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক সুমন। এছাড়া পলাতক পাঁচ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম শুনানি করেন। কারাগারে আটক এক আসামি আবদুল লতিফের পক্ষে ছিলেন খন্দকার রেজাউল করিম।

এর আগে গত ৯ মে উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। গত ১২ অক্টোবর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবেরো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য নতুন দিন ধার্য করেন।

২০১৬ সালের ২৮ জুন মামলায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ (চার্জ) আমলে নিয়ে বিচার শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পলাতক ৫ আসামি হলেন- জামাত নেতা আবদুল আজিজ, রুহুল আমিন ওরফে মঞ্জু, আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী, নাজমুল হুদা ও আবদুর রহিম মিঞা।

আজিজসহ গাইবান্ধার এই ছয় জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর। এক বছরের বেশি সময় তদন্তের পর ছয় খণ্ডে ৮৭৮ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা, যাতে ২৫ জনকে সাক্ষী করা হয়।

তদন্ত সংস্থা ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ওই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করলে প্রসিকিউশন শাখা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এর আগে ছয় আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের পলাতক দেখিয়েই এ মামলার কার্যক্রম চলে।

তদন্ত সংস্থা বলছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর বর্তমান গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান আসামিরা।

আসামিদের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ
প্রথম অভিযোগ: ১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আসামিরা পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর ২৫/৩০ জনকে সঙ্গে নিয়ে গাইবান্ধা সদর থানাধীন মৌজামালি বাড়ী গ্রামে হামলা চালায়। সেখানে চারজন নিরীহ নিরস্ত্র স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে আটক, নির্যাতন ও অপহরণ করে দাড়িয়াপুর ব্রিজে নিয়ে যায়। এর মধ্যে ব্রিজের কাছে গনেষ চন্দ্র বর্মণ এর হাত পা মাথার সাথে বেধে ব্রিজের নীচে নদীতে ফেলে দিয়ে হত্যা করে এবং তিনজনকে ছেড়ে দেয়। আসামিরা আটককৃতদের বাড়ীর মালামাল লুন্ঠন করে।

দ্বিতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, বিকাল অনুমান ৪টার দিকে আসামিরা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানাধীন মাঠেরহাট ব্রিজ পাহারা দিতে থাকাবস্থায় ছাত্রলীগ নেতা মো. বয়েজ উদ্দিনকে আটক করে মাঠেরহাটের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করতে থাকে। পরের দিন সকালে আসামিরা আটককৃত বয়েজকে সুন্দরগঞ্জ থানা সদরের পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তিনদিন আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন করার পর ১৩ সেপ্টেম্বর বিকালে গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটি চাপা দেয়।

তৃতীয় অভিযোগ: ’৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হতে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আসামিরা পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানাধীন পাঁচটি ইউনিয়নের নিরীহ নিরস্ত্র স্বাধীনতার পক্ষের ১৩ জন চেয়ারম্যান ও মেম্বরকে অবৈধভাবে আটক করে। তাদেরকে তিনদিন যাবৎ অমানুষিক নির্যাতন করার পর পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের নিকটে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে এবং লাশগুলি মাটি চাপা দেয়। সেখানে বর্তমানে শহীদদের স্মৃতির জন্য একটি বধ্যভূমি নির্মিত হয়েছে।

ছয় আসামির সংক্ষিপ্ত পরিচয়
জামাতের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজ মিয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চার দলীয় জোটের অধীনে গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জ-১ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ ১৩টি মামলা হয়। ২০১৩ সালে সুন্দরগঞ্জ থানায় চার পুলিশ সদস্য হত্যা মামলায় অন্যতম আসামি এই আজিজ।

বাকিদের মধ্যে জামাতের সুন্দরগঞ্জ থানা শাখার সক্রিয় সদস্য রুহুল আমিন মঞ্জুর (৬১) বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দুইটি মামলা হয়।

মো. আব্দুল লতিফ জামাতে ইসলামী সক্রিয় কর্মী এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ের নেতা। তার বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগসহ তিনটি মামলা হয়।

আবু মুসলিম মোহাম্মদ আলী মুক্তিযুদ্ধের আগে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সক্রিয় নেতা ছিলেন। পরে জামাতে ইসলামীর সক্রিয় কর্মী বলে তদন্ত সংস্থার তথ্যে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়।

১৯৭০ সাল থেকে জামাতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে দুটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে বিএনপির সক্রিয় কর্মী হলেও জামাতের সমর্থক করে বলে জানা যায়।

আর আব্দুর রহিম মিঞা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামাতের কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন- এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তার মানবতাবিরোধী অপরাধে দুইটি মামলা হয়।

সম্পাদনা : সূর্য দাস।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page