ইজতেমার ২য় দিনে ইবাদতে মশগুল মুসল্লিরা, কাল আখেরি মোনাজাত

নিজস্ব প্রতিবেদক/গাজীপুর সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে লাখো মুসল্লির পদভারে মুখর হয়ে উঠেছে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগতীর। ফাইল ছবি।

হিমেল হাওয়া ও শীত উপেক্ষা করে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিনে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল রয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা ধর্মপ্রাণ লাখো মুসল্লি। রোববার (২২ জানুয়ারি) বেলা ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে যেকোনো সময় মুসলিম জাহানের সুখ, শান্তি, কল্যাণ, অগ্রগতি, ভ্রাতৃত্ব কামনা করে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। আর এর মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তাবলীগ জামাতের দুই পর্বের ছয় দিনব্যাপী ২০১৭ সালের ৫২তম বিশ্ব ইজতেমা। চারদিন বিরতির পর ২০ জানুয়ারি, শুক্রবার ফজরের নামাজের পর আমবয়ানের মধ্য দিয়ে ঢাকার অদূরে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগতীরে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বিদের বয়ান শুনে, ইবাদত-বন্দেগি আর জিকির-আজকারের মধ্য দিয়ে ইজতেমার প্রথম দিন পার করেন মুসল্লিরা। ফজর নামাজের পর ভারতের মাওলানা শামীম মুসল্লিদের উদ্দেশে আমবয়ান করেন। তাঁর হিন্দি বয়ান বাংলায় অনুবাদ করেন বাংলাদেশের মাওলানা নুরুর রহমান। রোববার আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত মুরব্বিরা পর্যায়ক্রমে আখলাক, ইমান ও আমলের ওপর বয়ান পেশ করবেন। ১৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বিশ্ব ইজতেমার এ পর্বে অংশ নিতে ১৭টি জেলার পাশাপাশি বিদেশের মুসল্লিরা ইজতেমার ময়দানে নির্দিষ্ট খিত্তায় অবস্থান নিতে শুরু করেন।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ এই জামাতের প্রথম পর্বের তিন দিনব্যাপী ইজতেমা গত ১৩ জানুয়ারি, শুক্রবার শুরু হয়ে ১৫ জানুয়ারি, রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর ১৬ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি একটানা চারদিন বিরতি থাকে। ২০ জানুয়ারি, শুক্রবার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিন হওয়ায় ইজতেমা ময়দানে পবিত্র জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বের মতো দ্বিতীয় পর্বেও জুমার নামাজে দেশী-বিদেশী মুসল্লিসহ ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ গ্রহণ করেন।

২৬ খিত্তায় ১৭ জেলার মুসল্লি
১৬০ একর জমির ওপর অংশ নেওয়া জেলাগুলো হলো- ঢাকা (খিত্তা ১,২, ৩,৪, ৫ ও ৭), মেহেরপুর (৬), লালমনিরহাট (৮), রাজবাড়ী (৯), দিনাজপুর (১০), হবিগঞ্জ (১১), মুন্সিগঞ্জ (১২ ও ১৩), কিশোরগঞ্জ (১৪ ও ১৫), কক্সবাজার (১৬), নোয়াখালী (১৭ ও ১৮), বাগেরহাট (১৯), চাঁদপুর (২০), পাবনা (২১ ও ২২), নওগাঁ (২৩), কুষ্টিয়া (২৪), বরগুনা (২৫) ও বরিশাল (২৬)।

বিশ্ব ইজতেমার মুরব্বি গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রথম পর্বে নেওয়া সব প্রস্তুতি দ্বিতীয় পর্বেও বহাল রয়েছে। ইজতেমা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম দিকে বিদেশি মুসল্লিদের জন্য বিশেষ আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিদেশি নিবাসে রয়েছে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা।

২২৮টি স্পেশাল বাস সার্ভিস চালু
বিআরটিসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ইজতেমা উপলক্ষে বিআরটিসি বিভিন্ন রুটে ২২৮টি স্পেশাল বাস সার্ভিস চালু করেছে। চালু করা হয়েছে বিশেষ রেল সার্ভিস। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড তুরাগ নদের সাতটি স্থানে ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছে।

অন্যান্ন ব্যবস্থা
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ জানান, ইজতেমা মাঠে ১২টি নলকূপ স্থাপন করে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি গ্যালনের বেশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। অজু-গোসলের হাউস, টয়লেটসহ প্রয়োজনীয় স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশা নিধনের জন্য ২৪টি ফগার মেশিন ও ধুলাবলি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ডেসকোর টঙ্গী পূর্ব বিভাগের সহকারী উপ-প্রকৌশলী মো. হাসিবুল ইসলাম জানান, ইজতেমা এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো গ্রিড নষ্ট হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হবে না। ইজতেমা এলাকায় চারটি স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর ও পাঁচটি ট্রলি-মাউন্টেড ট্রান্সফরমার সংরক্ষণ করা হয়েছে।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপ-পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান জানান, ইজতেমাস্থলে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ফায়ারম্যানরা অবস্থান করছেন। ময়দানের প্রত্যেক খিত্তায় ফায়ার ডিস্টিংগুইশারসহ ফায়ারম্যান ও বিদেশি মেহমানখানা এলাকায় পানিবাহী গাড়ি, তিন সদস্যের ডুবুরি ইউনিট, একটি স্ট্যান্ডবাই লাইটিং ইউনিট ও পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকছে।

চিকিৎসাসেবা
টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পারভেজ আলম জানান, নিয়মিত শয্যা ছাড়াও অতিরিক্ত শয্যা বাড়িয়ে চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মন্নু গেট, অ্যাটলাস গেট, বাটা কারখানার গেট, টঙ্গী হাসপাতাল মাঠসহ ছয় জায়গায় অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সার্বক্ষণিকভাবে ১৪টি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের নিরাপত্তায় সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার থেকে ছয় হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য ইজতেমাস্থলে নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া, সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে পুলিশের কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হয়েছে। ইজতেমা এলাকায় বাইনোকুলার, সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে পুলিশ, স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, আনসার ও তাবলিগ সদস্যরাও কাজ করছেন বলে জানান পুলিশ সুপার।

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে লাখো মুসল্লির পদভারে মুখর হয়ে উঠেছে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগতীর। ফাইল ছবি।

উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকার রমনা উদ্যানসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে ১৯৪৬ সালে প্রথম ইজতেমার আয়োজন করা হয়। মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৪৮ সালে ইজতেমার স্থান পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পের স্থলে নেওয়া হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিলো। প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানরা অংশ নেওয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমদখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি ইজতেমায় অংশ নেন।

১৯২৭ সালে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর এলাকায় ইসলামী দাওয়াত তথা তাবলিগের প্রবর্তন করেন এবং একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মিলন বা ইজতেমারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশে ১৯৫০-এর দশকে তাবলিগ জামাতের প্রচলন করেন মাওলানা আবদুল আজিজ। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এই সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। পুরো সমাবেশের আয়োজনই করে থাকেন এক ঝাঁক ধর্মপ্রাণ মুসলমান স্বেচ্ছাসেবক- আর্থিক, শারীরিক সহায়তা দিয়ে প্রথম থেকে শেষাবধি তাঁরা এই সমাবেশকে সফল করতে সচেষ্ট থাকেন।

পুরো সমাবেশস্থলটি একটি উন্মুক্ত মাঠ, যা বাঁশের খুঁটির উপর চট লাগিয়ে ছাউনি দিয়ে সমাবেশের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শুধুমাত্র বিদেশী মেহমানদের জন্য টিনের ছাউনি ও টিনের বেড়ার ব্যবস্থা করা হয়। সমাবেশস্থলটি প্রথমে খিত্তা ও পরে খুঁটি নম্বর দিয়ে ভাগ করা হয়। অংশগ্রহণকারীগণ খিত্তা নম্বর ও খুঁটি নম্বর দিয়ে নিজেদের অবস্থান শনাক্ত করেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাওয়ারি মাঠের বিভিন্ন অংশ ভাগ করা থাকে। বিদেশী মেহমানদের জন্য আলাদা নিরাপত্তাবেষ্টনীসমৃদ্ধ এলাকা থাকে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরাই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর অনুপ্রবেশের অধিকার দেয়া হয় না।

সাধারণত তাবলিগ জামাতের অংশগ্রহণকারীরা সর্বনিম্ন তিনদিন আল্লাহর পথে কাটানোর নিয়ত বা মনোবাঞ্চা পোষণ করেন। সে হিসাবেই প্রতিবছরই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিনদিন জুড়ে। প্রতি বছরই এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিশ্ব ইজতেমা প্রতিবছর দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেয় কাকরাইল মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সাল থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং তিনদিন করে আলাদা সময়ে মোট ছয়দিন এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ আ’ম বয়ান বা উন্মুক্ত বক্তৃতার মাধ্যমে শুরু হয় এবং আখেরি মোনাজাত বা সমাপণী প্রার্থণার মাধ্যমে শেষ হয়। অনেক সাধারণ মুসলমান তিনদিন ইজতেমায় ব্যয় করেন না, বরং শুধু জুমা’র নামাজে অংশগ্রহণ করেন কিংবা আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন; তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন আখেরি মোনাজাতে। বাংলাদেশ সরকারের সরকার প্রধান (প্রধানমন্ত্রী), রাষ্ট্রপ্রধান (রাষ্ট্রপতি), বিরোধী দলীয় নেতাসহ অন্যান্য নেতা-নেত্রীরা আখেরি মোনাজাতে আলাদা-আলাদাভাবে অংশগ্রহণ করেন।

সম্পাদনা: রাজু আহমেদ।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page